
নীরব হলো এক প্রাণবন্ত কলম, আঁধারে ঢাকলো চাঁদের হাট: বিদায় কবি মাহবুব আনোয়ার বাবলু


চাঁদপুরের সাহিত্য ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের কালো ছায়া ফেলে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন কবি, রম্য লেখক, সাহিত্যিক এবং চাঁদপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহবুব আনোয়ার বাবলু। তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক পদের শূন্যতা নয়, বরং চাঁদের হাটের মতো আলো ছড়ানো এক প্রাণবন্ত মানুষের চিরবিদায়। চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির অন্যতম এই উজ্জ্বল সদস্যের প্রয়াণে মেঘনা-ডাকাতিয়ার তীরে জমেছে গভীর স্বজন হারানোর বেদনা।
মাহবুব আনোয়ার বাবলু কেবল রাজনীতির রাজপথেই সক্রিয় ছিলেন না; শব্দ আর বাক্যের বুনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক সাহিত্যভুবন। একদিকে ছিলেন স্পষ্টভাষী, দূরদর্শী ও রাজপথের লড়াকু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে ছিলেন কোমল হৃদয়ের এক সৃজনশীল সাহিত্যিক। পেশা ও নেশার এমন বিরল মেলবন্ধন খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। রাজনীতি যেখানে প্রায়শই কঠোর আর সমীকরণের খেলা, সেখানে বাবলু ভাই নিয়ে এসেছিলেন রম্য ও রসের এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ ছোঁয়া। তাঁর লেখনীর রম্যরস মানুষকে হাসিয়েছে, ভাবিয়েছে, আবার সমাজ ও রাজনীতির নানা অসঙ্গতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সূক্ষ্ম বিদ্রূপ ও ভালোবাসার মোড়কে।
চাঁদপুরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর উপস্থিতি ছিল সজীবতায় ভরা। চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির প্রতিটি আড্ডা, আলোচনা সভা ও সাহিত্য আসরে তিনি ছিলেন এক প্রাণপুরুষ। তরুণ সাহিত্যিকদের উৎসাহ দিতে তিনি কখনো কৃপণতা করেননি। নতুন লেখকদের জন্য তাঁর দরজা ছিল সবসময় খোলা, আর হৃদয় ছিল অপার ভালোবাসায় ভরা। তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল আনন্দের ঝিলিক, গুরুগম্ভীর আলোচনাতেও এক চিলতে রম্যরস ছড়িয়ে পরিবেশকে হালকা ও সতেজ করে তোলার এক অদ্ভুত জাদু ছিল তাঁর মধ্যে।


রাজনৈতিক ময়দানেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সর্বজনশ্রদ্ধেয়। বৈরী পরিবেশেও নীতি ও আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন এক বিশ্বস্ত অভিভাবক, আর সাধারণ মানুষের কাছে এক নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু আজ সেই চেনা কণ্ঠটি নীরব, সেই প্রাণোচ্ছল হাসিটি চিরতরে মিলিয়ে গেছে। চাঁদের হাটের যে আলো তিনি জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে এখন শুধু শূন্যতার আঁধার।
মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অনিবার্য সত্য, কিন্তু কিছু কিছু চলে যাওয়া মেনে নেওয়া বড় কঠিন। চাঁদপুরবাসী আজ তাদের এক প্রিয় সন্তানকে হারালো, সাহিত্য অঙ্গন হারালো এক দক্ষ কারিগরকে, আর রাজনীতি হারালো এক সৎ ও নিষ্ঠাবান কাণ্ডারিকে। মেঘনা নদী হয়তো আগের মতোই বইবে, চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমিতে হয়তো আবার বসবে নতুন সাহিত্য আসর, বিএনপির মিছিলে মিছিলে মুখরিত হবে রাজপথ—কিন্তু সেই সবকিছুর মাঝে বড্ড বেশি অনুভব হবে মাহবুব আনোয়ার বাবলুর অনুপস্থিতি।
শ্রদ্ধেয় বাবলু ভাই, আপনি শরীরী অস্তিত্বে আমাদের মাঝে আর নেই, তবে আপনার রেখে যাওয়া কবিতা, রম্যরচনা এবং স্মৃতির আলপনা চাঁদপুরবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে। পরম করুণাময় আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন এবং আপনার শোকার্ত পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দান করুন। বিদায়, হে প্রিয় সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কাণ্ডারি, বিদায়।




























