
চাঁদপুরে ৯ মাসে প্রায় ১০ হাজার বিদেশগামীর ওরিয়েন্টেশন
দক্ষ ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ গড়তে নিরাপদ অভিবাসনের পাঠ-সনদ নিয়ে পাড়ি বিদেশে


ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টার কাছাকাছি। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে দিনের কর্মব্যস্ততা যখন কেবল শুরু হওয়ার অপেক্ষায়, তখন চাঁদপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয় থেকে একটি ব্যাচের বিদেশগামী কর্মী তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশযাত্রার আগে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সনদ। সঙ্গে থাকছে নিরাপদ অভিবাসন, বিদেশের কর্মপরিবেশ, আইন-কানুন, আর্থিক লেনদেন, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণা।
এভাবেই দিনের শুরুতেই দায়িত্ব পালনের এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পান চাঁদপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শফিকুর রহমান। তাঁর দায়িত্ব পালনের এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিও বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষ, সচেতন ও নিরাপদ অভিবাসনের উপযোগী করে তুলতে নিয়মিত পরিচালনা করছে তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাসে প্রায় দশ সহস্রাধিক বিদেশগামী কর্মী এ ওরিয়েন্টেশন ক্লাস সম্পন্ন করে সনদ নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে বিদেশ যাওয়ার আগে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সচেতনতার পাঠ, যাতে তারা শুধু বিদেশগামী কর্মী হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা দক্ষ ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন।


সম্প্রতি গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন ডিইএমও এর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শফিকুর রহমান।
চাঁদপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচিতে বিদেশগামী কর্মীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাতে-কলমে ধারণা দেওয়া হয়। এর শুরুতেই বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সঙ্গে জেলা পর্যায়ে সম্পৃক্ত সরকারি কার্যালয়গুলোর পরিচিতি ও কার্যাবলি সম্পর্কে জানানো হয়।
এ সময় জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়, মেরিন টেকনোলজি, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
বিদেশ যাওয়ার আগে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে, কীভাবে নিরাপদে আর্থিক লেনদেন করতে হবে, যে দেশে যাচ্ছেন সেই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়া কেমন, এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে বোঝানো হয় বিদেশগামীদের।
ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অভিবাসী আইন-২০১৩ সম্পর্কে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনের সময় কোথায় সহযোগিতা পাওয়া যাবে-এসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হয় কর্মীদের। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুফল, কোনো সমস্যায় পড়লে কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং সেই অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়।
প্রবাসে বাংলাদেশের দূতাবাসের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা, দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় এবং বিদেশে কর্মস্থলে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার গুরুত্ব নিয়েও দেওয়া হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ।
সৌদি আরবে মেডিকেল স্টাফ পদে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশগামী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাগাদীর নাসরিন আক্তার বলেন, তিন দিনের এ প্রশিক্ষণে আমার অনেক অজানা তথ্য এখান থেকে জানতে পেরেছি। বিদেশে যাওয়ার পর কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখব, কী কী নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে এবং বিভিন্ন বিষয়ে কীভাবে সতর্ক থাকতে হবে,এসব সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এ প্রশিক্ষণের তথ্যগুলো আমার জন্য অনেক বেশি উপকার হবে।
ডিইএমও এর সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য এ ওরিয়েন্টেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে সেখানে গিয়ে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন এবং কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখবেন, সে সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
নিজের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের প্রসঙ্গে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, দেখেন, হয়তো এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঠিক সময়মতো অফিসে আসেন না। আর আমার প্রতিষ্ঠানে সকাল ৯টার মধ্যে অলরেডি একটি ব্যাচ ক্লাস শেষে বের হয়ে যায়। আর তখন নিজের কাছেই একটা মানসিক তৃপ্তি আসে।
তাঁর কথায়, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা ও সেবার মান নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদেশগামী কর্মীরা যেন সঠিক তথ্য নিয়ে, বৈধ ও নিরাপদ পথে বিদেশে যেতে পারেন এবং সেখানে গিয়ে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে কাজ করতে পারেন, ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য সেটিই।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক পরিবারের স্বপ্ন বদলে দেয়। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বিদেশগামী একজন কর্মীর জন্য শুধু বিদেশে যাওয়ার সুযোগই যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দক্ষতা, আইন সম্পর্কে ধারণা এবং নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতনতা। চাঁদপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তিন দিনের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি সেই প্রস্তুতির জায়গাটিই তৈরি করছে। নয় মাসে প্রায় দশ সহস্রাধিক বিদেশগামী কর্মীর প্রশিক্ষণ ও সনদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের পরিধিও স্পষ্ট হচ্ছে।
বিদেশে গিয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে এসব কর্মী একদিকে যেমন নিজেদের পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার পথ তৈরি করছেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আর সেই পথচলার শুরুতেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সচেতনতা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার পাঠ।



























