
লিবিয়ান মাফিয়ার বন্দিদশা থেকে ছেলেকে উদ্ধার করলেন বাংলাদেশি মা


মাফিয়াদের বন্দিশিবির থেকে একমাত্র ছেলেকে উদ্ধার করে আনলেন এক মা। ছেলেসহ দেশে ফেরার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বেশ তোলপাড় চলছে।
যে মা জীবনে কখনও ঢাকায় যাননি, দেখেননি নিজ দেশের রাজধানী। গ্রামীণ আট পৌঢ়ে জীবন ছেড়ে সেই মা উড়োজাহাজে চড়ে সোয়া ৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সুদূর লিবিয়ায় মাফিয়া বন্দিশিবির থেকে ছেলেকে উদ্ধার করেন। এ যেন থ্রিলার ছবিকে হার মানানো এক বাস্তব চিত্র।
অজপাড়াগাঁওয়ের শিক্ষাবঞ্চিত মা ত্রিপলী বিজয়ের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে। তিনি লিবিয়া প্রবাসী আবুল খায়েরের স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৪৫)।


সরেজমিন শাহিনুরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে অনেক লোকজনের ভিড়। সবাই মা ও ছেলেকে দেখতে আসছেন। শাহিনুর বেগম ও তার পুত্র ইয়াকুব হোসাইনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের দুঃসাহসী অভিযানের কাহিনি।
দেবিদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের আবুল খায়ের তার স্ত্রী, এক পুত্র ও দুই কন্যা ফেলে প্রায় ১১ বছর আগে ২০১১ সালে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। এরই মধ্যে ২ কন্যাসন্তানের বিয়ে হয়ে যায়। অভাবের সংসারে আরও একটু সচ্ছলতা আনতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ২০১৯ সালের মে মাসে একমাত্র ছেলে ইয়াকুব হাসানকেও নিয়ে যান লিবিয়ায়।
ইয়াকুব প্রথম এক বছর ‘আল হারুজ’ নামের একটি তেলের পাম্পে ৩৫ হাজার টাকায় এবং পরের এক বছর হাকজিলতন তেলের পাম্পে ৪৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। পিতা-পুত্রের আয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। পরে হবিগঞ্জের দালাল জাহাঙ্গীরের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আরও উন্নত জীবনের স্বপ্নে ইতালির পথ ধরে ইয়াকুব।
লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী থেকে নৌকায় করে ১৫০ জন ইতালি যাওয়ার পথে ল্যাম্ব দোসা দ্বীপে ‘মাফিয়াদের’ হাতে ধরা পড়েন তারা। ওখান থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য এক বাঙালি দালাল ধরে বাবার সহযোগিতায় চার লাখ টাকায় মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় দফায় মাফিয়াচক্র লিবিয়ার কোস্টগার্ডের কাছে তাদের বিক্রি করে দেয়।
কোস্টগার্ড ওখান থেকে তাদের অন্য একটি দ্বীপে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে চলে অমানবিক জীবন। একেকটি কক্ষে প্রায় ৬০-৭০ জনের অবস্থান। খাদ্য সংকট, শারীরিক নির্যাতনসহ নানা কারণে প্রতিদিনই মরছেন সঙ্গীরা। লাশের পঁচা গন্ধ, পেটের ক্ষুধা, পানিসংকট আর টাকার জন্য চলে বন্দুকের বাঁটের আঘাত ও পানির পাইপের পিটুনি। শরীরের ক্ষতচিহ্নে পচন ধরেছে ইয়াকুবসহ অন্যদের। প্রতিদিন একটি রুটি, কোনো দিন আধা রুটি খেয়ে শরীরের যন্ত্রণায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এ সংবাদে তার বাবা আবুল খায়ের স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ছেলের এমন খবর শুনে মা শাহিনুর বেগম পাসপোর্ট এবং ভিসা লাগিয়ে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি লিবিয়া যান। সেখানে স্বামীর সঙ্গে লিবিয়ায় বেনগাজি অবস্থান করে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইওএমের কর্মকর্তা এবং সেনাসদস্যদের সহযোগিতায় সেখান থেকে অর্থের বিনিময়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনেন। প্রায় ৬ মাসের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পায় ইয়াকুব।
সূত্র: যুগান্তর
E/N



























