
কওমি মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা: নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙার সময় এখনই


বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নয়; লাখ লাখ শিশুর শৈশব, শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে এটি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। বিশেষ করে হিফজ, নূরানি ও কিতাব বিভাগে পড়া বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় আবাসিক পরিবেশে থাকে। তাদের অনেকেই পরিবার থেকে দূরে, একই বয়সের এবং বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই আবাসিক পরিসরে বসবাস করে। ফলে এই ব্যবস্থায় শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি, নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর কাঠামো থাকা অপরিহার্য।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে বাংলাদেশের কাছে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ, নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস নেই। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কওমি মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। একই প্রতিবেদনে বিভিন্ন হিসাবের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ থেকে অনেক বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় আনুমানিক ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকার একটি সরকারি হিসাব জানিয়েছেন। অর্থাৎ সংখ্যার ক্ষেত্রেই যখন এত বড় অনিশ্চয়তা, তখন এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুনির্যাতনের প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ, তা নির্ণয় করা আরও কঠিন।
সংবাদে উঠে আসা নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০২১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাত্র ১৫ মাসে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৬২ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এবং তিন শিশুর মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।


তবে সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। JusticeMakers Bangladesh in France-এর ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৪৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি ঘটনা, অর্থাৎ ৫৭.১৪ শতাংশ, মাদ্রাসায় ঘটেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। একই পর্যবেক্ষণে ৪৬টি ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষককে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ইমাম ও প্রতিবেশীও কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন। সংগঠনটি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে এটি সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান নয় এবং কোনো ধর্মীয় বা পেশাগত গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার উদ্দেশ্যে এই তথ্য তৈরি করা হয়নি।
২০২৬ সালের আরেকটি সংবাদ বিশ্লেষণে চলতি বছরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জড়িত বা ভুক্তভোগী এমন অন্তত ৩৭টি ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন ছিল ছেলে এবং ৮ জন মেয়ে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৫টি অভিযোগে শিক্ষক অভিযুক্ত ছিলেন এবং অধিকাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ৭ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে।
এই সংখ্যাগুলোকে ‘কওমি মাদ্রাসায় সংঘটিত মোট যৌন নির্যাতনের সংখ্যা’ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ বাংলাদেশে এমন কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেস নেই যেখানে প্রতিটি কওমি মাদ্রাসা, শিক্ষার্থী, আবাসিক ব্যবস্থা, নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্ত ও মামলার তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষিত হয়। ফলে সংবাদে প্রকাশিত সংখ্যা প্রকৃত ঘটনার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কাই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় সমস্যা: অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান, অদৃশ্য শিশু
কওমি মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র্য ও স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হলেও কওমি মাদ্রাসা সেই একই সরকারি কাঠামোর অধীন নয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় একাধিক বেসরকারি বোর্ড রয়েছে এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ। গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কওমি মাদ্রাসা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নয় মানেই সেখানে আইন প্রযোজ্য নয়, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলাদেশের সাধারণ ফৌজদারি আইন, শিশু সুরক্ষা আইন এবং যৌন অপরাধসংক্রান্ত আইন এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সমস্যাটি মূলত আইন না থাকার চেয়ে বেশি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং দ্রুত জবাবদিহির ঘাটতি।
২০১৩ সালের শিশু আইনসহ বিদ্যমান আইনি কাঠামো শিশুদের সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করেছে। উপরন্তু, ২০০৯ সালে হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা সরকারি-বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য অভিযোগ কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
অতএব, ‘কওমি মাদ্রাসার জন্য কোনো আইন নেই’ বলা যেমন সঠিক নয়, তেমনি বিদ্যমান আইনি সুরক্ষা বাস্তবে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে বলাও কঠিন।
আবাসিক ব্যবস্থায় বাড়তি ঝুঁকি
কওমি মাদ্রাসার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আবাসিক শিক্ষা। হিফজ বিভাগের অনেক শিশু দীর্ঘ সময় মাদ্রাসায় অবস্থান করে। একই কক্ষে বা একই ফ্লোরে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের বসবাস, ঘুমানো ও দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ব্যবস্থা।
এ ধরনের পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বয়সভিত্তিক আবাসিক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক, নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষক, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ স্যানিটেশন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার।
শুধু সিসি ক্যামেরা বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং শোবার ঘর, বাথরুম বা ব্যক্তিগত পরিসরে ক্যামেরা বসানো শিশুদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে পারে। ক্যামেরা প্রয়োজন হলে তা করিডর, প্রবেশপথ, সিঁড়ি, গেট ও অন্যান্য উপযুক্ত সাধারণ স্থানে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। একই সঙ্গে ফুটেজ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
শারীরিক নির্যাতনও কম ভয়াবহ নয়
যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সংস্কৃতিও শিশুদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সহিংস শাসন যে ব্যাপক, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় UNICEF ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের MICS তথ্য থেকে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৮.৮ শতাংশ গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল; ৬৪.৬ শতাংশ শারীরিক শাস্তি এবং ৩০.২ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে নিয়ে UNICEF-এর একটি আঞ্চলিক গবেষণায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের একটি নমুনায় মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তির অভিজ্ঞতা ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল। এটি সমগ্র কওমি মাদ্রাসার বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান নয়; তবে মাদ্রাসা শিক্ষায় শারীরিক শাস্তি নিয়ে একটি গুরুতর গবেষণাগত সতর্কবার্তা।
সরকার ২০১১ সালেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করেছিল। সেই নির্দেশনায় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’-এর সংজ্ঞার মধ্যে মাদ্রাসাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষার্থীকে আঘাত করা, বেত বা হাত-পা দিয়ে মারা, চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া ইত্যাদি শারীরিক শাস্তির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই ‘শিক্ষক শাসন করছেন’ বলে শিশুকে মারধর, বেত্রাঘাত বা নির্যাতনকে ধর্মীয় শিক্ষা বা শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
কেন ঘটনা চাপা পড়ে?
শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অপরাধ নয়; অপরাধ গোপন রাখার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
একটি শিশু যখন শিক্ষক বা বড় কোনো শিক্ষার্থীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে অনেক সময় ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি শিক্ষক হন, তাহলে তার হাতে থাকে কর্তৃত্ব, ধর্মীয় মর্যাদা, শিক্ষাগত নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব। অন্যদিকে, ছোট শিশুদের অনেকেই বুঝতেই পারে না যে তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান’ রক্ষার মানসিকতা। অনেক পরিবার অভিযোগ করলে সন্তানকে মাদ্রাসা থেকে বের করে নেওয়া, সামাজিক অপমান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার ভয় পেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তার বদলে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষাই অগ্রাধিকার পেয়ে যায়।
এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে শুধু আইন, ক্যামেরা কিংবা নতুন কমিটি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
বেফাকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এককভাবে যথেষ্ট নয়
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ কওমি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি বোর্ড। এর পরীক্ষাব্যবস্থার আওতায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ২০২২ সালে যেখানে বেফাকের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২,২৫,৬৩১, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩,৪৯,৭৭৬ হয়েছে বলে ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু একটি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নেওয়া বা সনদ দেওয়ার দায়িত্ব এবং একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এক নয়।
শিশু নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত, আবাসিক নিরাপত্তা নিরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগে যাচাই, অভিযোগকারীর সুরক্ষা, অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানো, বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং এবং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা নিবন্ধন ব্যবস্থা একটি বৃহত্তর regulatory framework-এর বিষয়।
তাই বেফাকসহ সংশ্লিষ্ট কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোকে সম্পৃক্ত করে রাষ্ট্রীয় শিশু সুরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে কওমি মাদ্রাসাগুলোর কার্যকর সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
সরকারের করণীয় কী?
প্রথম কাজ হওয়া উচিত জাতীয় কওমি মাদ্রাসা ডাটাবেস তৈরি করা। কোন মাদ্রাসা কোথায়, সেখানে কতজন শিক্ষার্থী, কতজন আবাসিক, কতজন শিক্ষক, আবাসিক ভবনের ধারণক্ষমতা কত, কোন বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কারা এবং শিশু সুরক্ষার দায়িত্বে কে আছেন, এসব তথ্য নিবন্ধিত থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম শিশু সুরক্ষা মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে:
শিক্ষক ও আবাসিক কর্মীদের পরিচয় ও নিয়োগ যাচাই;
শিশু সুরক্ষা বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ;
বয়সভিত্তিক আবাসিক ব্যবস্থা;
নির্দিষ্ট অনুপাত অনুযায়ী আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক;
নিরাপদ অভিযোগ বাক্স ও গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা;
প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাধীন অভিযোগের পথ;
করিডর, প্রবেশপথ ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা;
শিশুদের জন্য নিয়মিত safeguarding orientation;
গুরুতর অভিযোগে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
তৃতীয়ত, প্রতিটি মাদ্রাসায় একজন Child Protection Focal Person থাকা উচিত। তিনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি একটি স্বাধীন সরকারি বা স্বীকৃত শিশু সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
চতুর্থত, শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ‘মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ সালিশে’ বিষয়টি মীমাংসা করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী পুলিশ, শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
অভিযোগ করার পথ আরও দৃশ্যমান করতে হবে
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য ইতোমধ্যে Child Helpline 1098 রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত এই সেবায় দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিশু নির্যাতন, সহিংসতা ও শোষণের ঘটনায় শিশু নিজে অথবা তার হয়ে অন্য কেউ বিনামূল্যে যোগাযোগ করতে পারে। সেবাটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার কথা সরকারি তথ্যেই উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু একটি সাত-আট বছরের আবাসিক শিশু ১০৯৮ নম্বর জানবে কীভাবে? সে ফোন করার সুযোগ পাবে কীভাবে? অভিযোগ করার পর তাকে কোথায় নেওয়া হবে? অভিযোগকারী শিশুকে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কীভাবে নিরাপদে সরানো হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রতিটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা পরিকল্পনায় থাকা উচিত।
সংস্কার মানে কওমি শিক্ষার বিরোধিতা নয়
কওমি মাদ্রাসা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি চরম অবস্থান এড়িয়ে চলা জরুরি। একদিকে সব কওমি মাদ্রাসাকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন অন্যায়, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কারণে সেখানকার শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমন ধারণাও বিপজ্জনক।
অসংখ্য কওমি মাদ্রাসা নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে এবং অসংখ্য শিক্ষক আন্তরিকভাবে শিশুদের দেখাশোনা করছেন। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে অপরাধ ঘটলে পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসংগত নয়।
কিন্তু একই কারণে কোনো নির্যাতনের ঘটনাকেও ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে একটি শিশুর নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, শাস্তি নয় শুধু প্রতিরোধ
কওমি মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুধু অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি দিলেই হবে না। প্রয়োজন prevention, protection, reporting, investigation and accountability—এই পাঁচটি স্তম্ভকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
একটি মাদ্রাসায় কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তার প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘এ কথা বাইরে জানালে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে কি না?’ বরং প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘শিশুটিকে এখনই কীভাবে নিরাপদ করা যায়?’
ধর্মীয় শিক্ষা শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখানোর কথা। সেই শিক্ষার পরিবেশেই যদি কোনো শিশু যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর প্রকৃত পরিসংখ্যান যত দ্রুত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হবে, তত দ্রুত শিশু সুরক্ষার কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব হবে। বেফাক ও অন্যান্য কওমি বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, আলেমসমাজ, অভিভাবক, শিশু অধিকার সংগঠন এবং সরকারকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে একটি জাতীয় safeguarding framework গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
কারণ একটি শিশুর ধর্মীয় শিক্ষা পাওয়ার অধিকার যেমন আছে, তেমনি তার নিরাপদে বেঁচে থাকা, নির্যাতনমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকারও সমানভাবে আছে।
মোহাম্মদ আরিফ ইমাম
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ,
বেলচোঁ কারিমাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা,
হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।




























