
শাহরাস্তিতে পুলিশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে মাদক ব্যবসায় লেনদেনের অভিযোগ, অভিযুক্ত সাতজনকে বদলী, তদন্ত কমিটি গঠন


চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে পুলিশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে মাদক ব্যবসা। জনতার হাতে আটক মাদক ব্যবসায়ী মিজান হোসেনের মোবাইলে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ভয়েস ক্লিপ ও চ্যাট পাওয়ার অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ সুপার তাৎক্ষণিক এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরমধ্যেই সাতজনকেই বদলী করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। তদন্ত শেষে নেয়া হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা।
দোকানের চারপাশে ফুটন্ত ফুলের টব। মধু নিতে ছুটে আসে মৌমাছি। দেখতে সাধারণ ফুলের দোকান। আলাদা কোনো নাম নেই। এলাকায় ‘মিজানের দোকান’ বলেই পরিচিত। কিন্তু ফুলে ফুলে সাজানো সেই দোকানেই ছুটে যান মাদকের ক্রেতারা। সেই তালিকায় আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।


অভিযোগ উঠেছে, সেই পুলিশদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই প্রকাশ্যে রমরমা মাদক ব্যবসা চলছে চাঁদপুরের শাহরাস্তির আয়নাতলী বাজার সংলগ্ন মিজানের এই দোকানে।
এবার আর রক্ষা হলো না। জনতার হাতে ধরা পড়ে ফাঁস হলো সব।
একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রচারপত্রে প্রধান অতিথি এই মাদক ব্যবসায়ী মিজান হোসেনের নাম দেখে হতবাক এলাকাবাসী।
গেল ২৮ জুলাই উত্তেজিত জনতা মিজানকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে যান চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। তার মোবাইল যাচাই করে শাহরাস্তি মডেল থানার এসআই মোঃ আরিফ হোসেন, মিঠুন দাস, এএসআই মোঃ শহীদুল্লাহ, এরশাদ হাজারী, কনস্টেবল শরিফুল ইসলাম, বাবুর্চি নজরুল ইসলাম ও উঘারিয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই রফিকুল ইসলামের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও ভয়েস ক্লিপে তাদের সঙ্গে টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া এলাকাবাসী।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, “নাগরিক যারা আছি আমরা খবর পাই, খবর পাই এলাকাবাসী যায় তারে ধরে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসি। আসার পরে সে তার মোবাইল জব্দ করে। সাংবাদিক ভাইরা আসে, মোবাইল জব্দ করে। জব্দ করার পরে সব তথ্য মোবাইল থেকে কিছু তথ্য নেয়। আর তার মুখের স্বীকারোক্তিতে কিছু অনেক কথা বলে। কি হইছে, না হইছে, কিভাবে সে কি করে। তারে যে মাদক সম্রাট এটা কিভাবে গড়ে তুলছে, সে কি সহযোগিতা করছে, কে কে চাঁদা নেয়, না নেয় সব কিছু বলছে। এই আমাদের এলাকায় যারা গণ্যমান্য যারা আছে তারা সবাই এগুলো লিস্ট করছে। লিস্ট করার পরে সে এখন পলাতক আছে মিজান।’
আয়নাতনী বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা দেখলাম যে তার যে মোবাইলটা, মোবাইলটা আমরা হাতে নিছি। কয়েকজন মিলে নেওয়ার পরে দেখলাম যে মোবাইলে বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার এই যে টাকা দেওয়ার কথা বা বিভিন্ন যে কি বাবা ট্যাবলেট দেওয়ার কথা। এই ধরনের কিছু প্রমাণ আমরা পেয়েছি। মিজানের সাথে সব সময় দেখি, এই পুলিশরা কেউ অনেক সময় dress পরে আসে, কেউ civil এ আসে, মিজানের দোকানে যায়। তো যদি এলাকার জিজ্ঞাসা করা যে ভাই আপনারা এখানে কেন আসেন? বলে যে আমরা মিজানের কাছে আসছি আসামী ধরার জন্য।
এখন মিজান এলাকার কি? একজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে কিভাবে আসে হেল্প নেওয়ার জন্য পুলিশ অফিসার। আসবে গ্রামের ওয়ার্ডের সভাপতি আছে, ইউনিয়ন সভাপতি আছে, গ্রামের যারা গণ্যমান্য আছে তাদের কাছে আসবে সাহায্যের জন্য। যে এলাকার কোন লোকটা খারাপ, কোনটা ভালো। কিন্তু একজন অপরাধীর কাছে কেন পুলিশ আসে? আমরা এটা বন্ধ হইতে হয়। এটা আমরা আবেদন জানাচ্ছি। এলাকাবাসী যাতে পুলিশ কখনও মানে এইভাবে মাদক সেবনকারী বা যারা ব্যবসা করে তাদেরকে আর প্রশ্রয় না দেয়। এটা আমাদের দাবি। ‘
এলাকাবাসী আরো জানান, মাদক কারা কারা সেবন করে, কারা বিক্রি করে, বা তাদের মাধ্যমে হচ্ছে। সবকিছু মিজানের মুখ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার মাধ্যমে সেটা প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশে যদি পুলিশ প্রশাসন চিন্তা করে, যে আগামী চব্বিশ ঘন্টার ভিতরে দেশে কোন দুর্নীতি, মাদক কোন কিছুই থাকবে না। সেটা সম্ভব হবে। সম্পৃক্ততা আছে বিদায় বলেছে। সম্পৃক্ততা না থাকলে তো আর বলতো না। না পুলিশ।
ইউপি চেয়ারম্যান মো. জোবায়েদ কবির বাহাদুর
পুলিশ মিজানের দোকানে আসতো। আসলে একজন অপরাধীর কাছে তো পুলিশ যাবে। তবে সে যাওয়াটা কি অপরাধীকে এই নির্মূল করার জন্য না সহযোগিতা করার জন্য? এই বিষয়টা আমাদের এই আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করেছি। উনারা গুরুত্ব সহকারে বিষয়টা খতিয়ে দেখতেছেন। আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন।”
মিজানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন যাচাই করতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। ভয়েস ক্লিপ ও চ্যাটে অর্থ লেনদেনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
আটকের পর মিজান স্বীকার করেন, মাদক ব্যবসা চালাতে তিনি নিয়মিত মাসোহারা দিতেন। তার নিয়মিত অর্ধশত ক্রেতা রয়েছে। পরে আর মাদক ব্যবসা করবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। বর্তমানে মিজান জনরোষের ভয়ে গ্রামছাড়া।
এরআগে মিজান হোসেন এলাকাবাসীর কাছে জবানবন্দিতে বলেন, ‘ যেমন নজরুলের চাইছে যে আপনি কি থানায় কোনো মানতলি দিয়া কাজ করবেন? আমি কইছি বর্তমানে জিরো টলারেন্স। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিছে… নজরুল কে? নজরুল হলো আমাদের বাবুর্চি।
“হেরা নরমাল লোক দিয়া কথা বলায়। ওনারা কথা বলেন। থানার অফিসারও। হ্যাঁ। তো এখন যাইয়া আমি বলছি যে না জিরো টলারেন্স । তারেক রহমানের জিরো টলারেন্স দিছে বটে। মানে মাদকের বিরুদ্ধে।
এ কথাটা আসছে যে আমি মাদক সেবন করি, মাদক বিক্রি করি। এই মানতলি তুমি দাও কিনা। হ্যাঁ। আমি মানতলি দিই না। আমি প্লাস তাদেরকে হেল্প করি। আর আমার থেকে মান্থলি চাইছে। আমি দিই নাই। অনেকেই চাইছি। ‘
তার মুঠোফোনের ভয়েস কলে পাওয়া তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘আমার থেকে চাইছে। আমি দেই নাই।
কারা এরা? বাবলু চাইছে, আলমগীর চাইছে। হুম। আমি দেই নাই। কিসের টাকা? কি জন্য চাইছে টাকা? যে আমা… আমাগো এই সমস্যা আছে, ওই সমস্যা আছে। বিভিন্ন একটা ফলস দেইখায় চাইছে। আমি দেই নাই।
এমন কি আমি কিছু লোকরে টাকা দিছি। এটা এখানে আমি এই জবানবন্দি দিছি।
প্রশাসনের সাথে আমার সাথে যোগাযোগ হইল। এই ওয়ারেন্টের আসামীর জন্য আমার দোকান থেকে দৌড়াইতে হয়। দেওয়ার পরে যাইয়া কোথাও মালার আসামী ধরছে। মোটরসাইকেল তো হচ্ছে ওগুলো নিয়া আমি থানায় যাইতে হয়। যদি আমি না যাই মনে করেন এটা আমার উল্টা ক্ষতি।
আমাদের শহীদ স্যার উনি যোগাযোগ রাখে। আরিফ স্যার আছে, আরিফ ছাড়াও যোগাযোগ রাখেন।”
“যোগাযোগ রাখে। সবাইরে হেল্প করি। আসামী ধরার জন্য আমরা বিশ জন লোক অ্যারেস্ট করতে সফল হয়েছি। এই গত পনেরো দিনের ভিতরে।
আমার মাধ্যমে টাকাটা আমি থানায় পাঠাইছি।
থানায় কাকে পাঠাইছেন? বাবুচিরে।
নজরুলের কাছে টাকা পাঠাইছেন? কার জন্য পাঠাইছেন এটা? পাঠাইছি এটা আমাদের শহীদ স্যারের জন্য।’
এ বিষয়ে শাহরাস্তি মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে সাতজনকেই বদলী করা হয়েছে। তদন্ত শেষে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে সহকারী পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন।
শনিবার দোয়াভাঙ্গা কচুয়া-শাহরাস্তি সার্কেলের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা লিখিতভাবে ঘটনার ব্যাখা দিচ্ছেন।
অপরদিকে প্রশাসন ইতোপূর্বে তিনবার মিজানের দোকান ভেঙে দিলেও আবার গড়ে তোলে। তার বিরুদ্ধে ৭টি মাদক মামলা রয়েছে। একাধিকবার গ্রেফতারও হয়েছেন বলে জানান সহকারী পুলিশ সুপার মো. আবদুল হাই চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘গত আঠাশ, আঠাশ জুলাই একজন মাদক ব্যবসায়ীকে যে পাবলিক কর্তৃক ধৃত, তার কাছ থেকে আমাদেরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার মোবাইলে তার নাম, তাদের নাম্বার সেভ করা ছিল এবং কয়েকটা ম্যাসেজ ছিল। এই সংক্রান্তে পুলিশ সুপার চাঁদপুরের নির্দেশে ঘটনাটির বিষয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট সংক্রান্তে এটা তদন্ত কমিটি করা। তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের শেষে যথা সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এবং আমাদের দায়ী যদি কেউ থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এতে তার বিরুদ্ধে সাতটা মাদক মামলা এবং একটা অন্যান্য খাতে একটা মামলা আছে। সে বর্তমানে পলাতক আছে। তারপর তো সে পলাতক আছে। এলাকায় নাই। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’
ফুলের দোকানের আড়ালে মাদকের এই কারবার এবং পুলিশের সম্পৃক্ততার ঘটনায় এখন শাহরাস্তি জুড়ে চরম আলোচনা ও ক্ষোভ।
স্থানীয়রা মাদক প্রতিরোধে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান।


























