
চাঁদপুরে দালালের খপ্পরে পড়ে কিরগিস্তান, এখন দেশে আসার আকুতি


দালালের খপ্পরে পড়ে কিরগিস্তান যাওয়ার তিনদিন পর ভিসার মেয়াদ শেষ। মারধর ও খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাঁদপুরের মতলবের যুবকসহ কয়েকজন। এখন দেশে আসার আকুতি তাদের। এদিকে মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তানেরা ভিডিও বার্তা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সরকারের কাছে দালালচক্রের সুষ্ঠু বিচার ও প্রবাসী শরীফকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবী জানান পরিবার। এদিকে দালালচক্র ভিসার মেয়াদ অল্প ছিল বলে স্বীকার করে বলছেন, সেখানে গিয়ে ভিসা নবায়ণ করেনি। তাই এই সমস্যায় পড়েছে।
একটি ঝুপড়ি ঘরে মা-বাবা, স্ত্রী ও তিন সন্তানের বসবাস করছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মোহাম্মদ শরীফের পরিবার। একটি ঘর ও পরিবারের সুখের আসায় গার্মেন্টেসের চাকরি ছেড়ে পাড়ি দেন কিরগিস্তান। বিদেশ যাওয়ার পর মাত্র একদিন পরিবারের সাথে কথোপকথন হয়। তারপর আর কোন যোগাযোগ হয়নি। হঠাৎ ভিডিও বার্তায় মোহাম্মদ শরীফের বাঁচার আকুতি ও কিরগিস্তানে কষ্টময় দিনগুলোর বর্ণনা শুনতে পান পরিবার। ওই ভিডিও বার্তায় শরীফ দালালের নাম উল্লেখ করে বিচার ও দ্রুত দেশে ফেরার আকুতি জানান।
কিরগিস্তান থেকে প্রবাসী মোহাম্মদ শরীফ ভিডিও বার্তায় জানান, আমার বাড়ী মতলব উত্তরে। আমি দুই বছর অপেক্ষা কইরা কিরগিস্তান আইছি। দালালে আমারে কইছে মালয়েশিয়ায় পাঠাইবো। মালয়েশিয়ার নাম কইয়া এই কিরগিস্তান পাঠাইছে। কিরগিস্তান আইছি গার্মেন্টস ভিসায়। এখন গামেন্টর্স ভিসা না দিয়া স্ট্রেবরির মাজরার কাজে। বৃষ্টি বাদল দিয়া এতো ঠান্ডা দিয়া আমি কাজ করি। কাজ করার পরে টাকা পাই না। টাকা চাইলে মারধর করে। খাওন ঠিকমতো দেয় না। খুবই কষ্টের ভিতর আছি।


আমরা কয়েকজন একটা কনটিনারের ভিতরে জীবন-যাপন করতাছি। ওদের যে সময় মন চায়, সেসময় কাজে নিয়া যায়। কাজ করার পরে টাকা দেয় না, মারধর করে।
এদেশে আসার তিন পরই ভিসার মেয়াদ শেষ। পাসপোর্ট নাই। ভিসা নষ্ট। এই্ অবস্থায় আমরা খুবই কষ্টের মধ্যে আছি। যত তাড়াতাড়ি পারেন, আমাগোরে বাংলাদেশে নেয়ার ব্যবস্থা করেন ভাই।
শরীর অসুস্থ নিয়া কাজ করতে হয়। বাংলাদেশে থেকে আইছি ১৭/১৮ দিন। গোসল করতে পারছি ২/৩ দিন। তাও ঠান্ডা বরফ পানি দিয়া। আমার দালালের নাম আকতার। তার সহকারি নাসিম। ইয়ার ট্র্যাভলস, পল্টন।
বিদেশ যাওয়ার এক মাস না যেতে এমন খবরে আর্তনাদ শরীফের পরিবারে। বিভিন্ন এনজিও থেকে কিস্তি ও ধার দেনায় জর্জরিত তারা। একদিকে তিন সন্তানের ভরণ-পোষণ, অন্যদিকে কিস্তি নিয়ে বিপাকে স্ত্রী।
কান্নাজড়িত কন্ঠে মেয়ে বলেন, আমি মানা করছিলাম বিদেশ যাইতো না। আমারে বলছিলো, তুমি ভালো থাইকো। আমি আবার আইসা পরুম।
স্ত্রী বলছেন, গার্মেন্টেসে চাকরী করতো আগে। ভালই চলছিল। দালালের মাধ্যমে পড়ে বিদেশ গেছে। দালালে কইছে ভালো, ভালো- যাও।
আমার স্বামীরে এহন বাড়ীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অনেক টাকা ঋণ কইরা গেছে। চার লাখ টাকা ঋণ করে গেছে। আমি এই টাকা ঋণ কিভাবে দিমু। তিনটা বাচ্চা রেখে গেছে। কিভাবে চালামু। ওই দালালের শাস্তি দেন । আমি আমার স্বামীরে বাড়ীতে পাঠাইয়া দেন। আর কিছু চাই না।
ভিডিও বার্তা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা-বাবা। এই বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে দাবী করেন তারা।
মা জাহানারা বেগম বলেন, আমার ঘর নাই, কিছু নাই। তিন/চারটা পোলাপাইন। পুতে ব্রাকের থেকে চার লাখ টাকা কিস্তি তুলে, জিনিসপত্র বেইচা আর ঋণ কইরা গেছে। এখন ঋণওয়ালা বাড়ী এসে অপমান করে। আমার পোলারে দেশে আইনা দাও, নইলে মইরা যাইমু। সরকারে যেন আমার ছেলেরে আইনা দেয়। দালালে পরামর্শ দিয়ে পোলারে নিছে। এখন ভিসার মেয়াদ নাই। সরকারে যেন আমার পুতেরে আইনা দেয়, আমার দ্বারে।
বাবা মো. হোসেন গাজী বলেন, সরকারের কাছে চাই, আমার ছেলে যেন কষ্ট না পায়। বাংলাদেশে ছেলেকে ফিরা দেক। যেই দালালে নিছে টাকা পইসা খাইয়া , হেই দালাল আমাগো লড়ে চিটিংবাজি করছে। এখন দালালের বন্তবোস্তা করে আমার ছেলেকে ফিরাইয়া দেখ। প্রায় চার লাখ টাকার মতো ঋণ করে গেছে।
এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বিদেশ পাঠানোর টাকা নিচ্ছেন আকতার ও নাসিম। তারা নারায়ণগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকতার হোসেন মুঠোফোনে প্রায় দেড় লাখ টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেন। ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। ভিসার মেয়াদ অল্প ছিল। সেখানে যাওয়ার পর রেনু হওয়ার কথা। বাকী টাকা না দেয়ায় আর রেনু হয়নি। তার ধৈর্য্য নেই, সে ওখান থেকে অন্যত্র সরে যায় বলে জানান দালাল চক্রের সদস্য আকতার হোসেন।
মোহাম্মদ শরিফের মতো আরো ১২ জন রয়েছেন এই বন্দিদশায়। গেল সপ্তাহে তারা একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে বাঁচার আকুতি জানান। মোহাম্মদ শরীফ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার উত্তর পাঁচানি গ্রামের গাজী বাড়ির বাসিন্দা।








