মতলব উত্তরে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকিশিল্প

সুমন আহমেদ
আপডেটঃ ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৪ | ৭:৫৮
Link Copied Successfully!
পূর্ব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে। চারদিক পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত। এমনই পরিবেশে কৃষকের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভানে গৃহিনীরা। পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ ভেসে বেড়ায় কৃষকের আঙিনায়। বলছিলাম আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকির কথা যা এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এক সময় মতলব উত্তরে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি লুকিয়ে ছিল আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন জনপদে। ভোরের আজানের পাশাপাশি স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ ছড়িয়ে পড়তো গাঁও গ্রামের চারদিকে। এখন সেই শব্দ নেই। চোখে পড়ে না বিয়ে শাদির উৎসবের ঢেঁকি ছাঁটা চালের ফিরনি-পায়েস।
অথচ একদিন ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনা করাও কঠিনতর ছিল। যেখানে বসতি সেখানেই ঢেঁকি। কিন্তু আজ তা আমাদের আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও মাঝে মধ্যে গ্রামীণ জনপদে কিছু উৎসব-পার্বণে পিঠা বানানোর জন্য চালের গুঁড়া তৈরি করতে পুরোনো ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ শোনা যায়। আত্মীয়-স্বজন একসঙ্গে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চালের গুড়া তৈরিতে যে আনন্দ পেয়ে থাকে তা কলে ছাঁটায় পাওয়া কখনো সম্ভব নয়।
এখন শিক্ষার প্রসার গ্রামেও বিস্তার লাভ করেছে। গ্রামের বউ ঝিরা বলতে গেলে প্রচলন না থাকাই অবশ্য ঢেঁকির এসব কর্মকাণ্ড প্রায় ভুলেই গেছে। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া বৃদ্ধা বা বয়স্ক মহিলারা গর্ব করে বলত এই ঢেঁকি আমার দাদা শ্বশুরের আমলের। শীতকালের পাখিডাকা ভোরে নবান্নের আনন্দে মেতে উঠত অজপাড়াগাঁ। এ সময় ঢেঁকির শব্দ কৃষককে মাঠে যাওয়ার জন্য তাড়া দিত।
গ্রাম বাংলার ঘোমটা পরা বধূরা বিভিন্ন কায়দা-কানুনে ঢেঁকির তালে তালে তাদের বাপ-দাদার আমলের গীত গেয়ে চলত। কিন্তু এখন সর্বত্রই অসংখ্য যান্ত্রিক ধান ভাঙার মেশিন ঢেঁকির সেই মধুময় ছন্দ কেড়ে নিয়েছে। গ্রামীণ জনপদেও সেই কর্ম চঞ্চলতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এ যন্ত্র। ঢেঁকি একটি শিল্প। এক সময় ঢেঁকি শিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। ছিল ঢেঁকি থেকে উৎপাদিত চালের ব্যাপক প্রচলন। মতলব উত্তরে একসময় শত শত পরিবার সরাসরি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। তৎকালীন সময়ে ঢেঁকিতে চাল ভানানীরা তাদের উৎপাদিত চাল বিক্রি করে আর্থিকভাবে যেটুকু লাভবান হতো তাতে করে তারা কেবল নিজেদের সংসার খরচই মেটাত না, সেই সঙ্গে কিছু টাকা-পয়সা অন্য খাতে বিনিয়োগ অথবা সঞ্চয়ও করতে পারত। আধুনিক চাল কলের ব্যাপক প্রসারের কারণে ঢেঁকি শিল্পীদের অনেকেই অর্ধাহারে, অনাহারে দিনমজুরি, ইটভাটাসহ বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। তা ছাড়া কেউ কাঁথা সেলাই আবার কেউবা দর্জির কাজ করেন। গ্রামীণ সাধারণ মহিলাদের কাছে এটি ছিল অতীব প্রয়োজনীয় একটি কর্মসহায়ক হাতিয়ার। অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থের বাড়িতে ঢেঁকির সংখ্যা দ্বারাই বিচার হতো কে কত বড় গৃহস্থ। ঢেঁকি তৈরির জন্য বাবলা, কড়ই গাছ আগে থেকেই বাছাই করে রাখা হতো। আবার নিজের পছন্দের কাঠ দিয়ে ঢেঁকি তৈরি করত অনেকে। কেউ কেউ নকশাদার শৌখিন ঢেঁকি তৈরি করত।
আর এ ঢেঁকি তৈরির জন্য খোঁজা হতো ভালো কারিগর বা মিস্ত্রি। সময় নিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে কারিগররা ঢেঁকি তৈরি করে দিত। আর সেই ঢেঁকি মনঃপুত হলে গৃহস্থরা বিভিন্নভাবে তাদের পুরস্কৃত করত। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে সেই আদিকালের ধান ভাঙানের এ কাঠের উপকরণটি। ধানভাঙা কলের করাল গ্রাসে তা আজ আমাদের সংস্কৃতি থেকে মুছে যাচ্ছে। এক সময় ঢেঁকি নিয়ে কবি সাহিত্যিকরা কত না কবিতাই রচনা করেছেন আর বাউলরা গেয়েছেন গান। আজ আর সেই দিন নেই।
পঞ্চাশের দশকে এ দেশে শুরু হয় চাল কলের প্রচলন। তারপর দীর্ঘ সময়ে তা দেশের গ্রামে গঞ্জে পৌঁছে গেছে। এখন কৃষকও ধান কলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আবার সুপার শপগুলোয় প্যাকেটজাত ঢেঁকি ছাঁটা চাল আসতে শুরু করেছে। ক্রেতাদেরও আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের। পূর্বে হেমন্তে ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দে মুখরিত হতো গৃহস্থ বাড়ির আঙ্গিনা। মহিলারা সংসারের হাজারো অভাব অনটনের ভেতরেও নিজেদের ক্লান্তি ঢাকার জন্য ঢেঁকির তালে তালে সমবেত হয়ে গান গেয়ে ধান ছাঁটাইয়ের কাজ করতেন। কয়েক দশক আগেও গ্রামে গেলেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি চোখে পড়ত। গৃহস্থের বাড়িতে ঢেঁকি থাকত একাধিক। তখন গ্রামে মহিলাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত কে কত ভোরে উঠে ঢেঁকিতে পাড় দিতে পারে বা বেশি ধান ভানতে পারে। ঢেঁকির শব্দে কৃষকের ঘুম ভেঙে যেত। মহিলারা যখন ধান ভানে তখন তাদের হাতের চুড়ি কিংবা কাঁকনের ঝনঝন শব্দ হতো। শব্দ হতো পায়ের নূপুরের। সব মিলে এক সঙ্গীতমুখোর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। এখন গ্রামে গেলে কারও কারও বাড়িতেই ঢেঁকি দেখা যায়। বর্তমানে সেগুলো অধিকাংশই অব্যবহৃত অবস্থায় গরুর গোয়ালঘরে কিংবা পরিত্যক্ত কোনো ঘরে পড়ে আছে। ঢেঁকির আওয়াজের সঙ্গে মহিলাদের চুড়ি আর নূপুরের সমন্বয়ে এর শব্দ এখন আর নেই। বর্তমানে এই ঢেঁকির গল্প শোনা যাবে শুধু নানি-দাদিদের মুখে মুখে। এ ছাড়া এখন শোনা যায় যন্ত্রচালিত রাইস মিলের শব্দ। হয়তো বিভিন্ন জাদুঘরে গিয়ে দেখা যাবে এই ঢেঁকি। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। এক সময় সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আর্বিভাব ঘটেছিল। আর এখন গতিময় সভ্যতার যাত্রা পথে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেই বিলুপ্ত হতে চলছে আবহমান বাঙালির হাজার বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্য ঢেঁকি শিল্প। ইতিহাসের সেই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে চিরদিন-চিরকাল।

ট্যাগ:

শীর্ষ সংবাদ:
বর্জ্যের বিনিময়ে খাদ্য ও গাছ; ক্লিন চাঁদপুরের ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ চাঁদপুরে জেলা পুলিশের ১ম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ উদ্বোধন মতলব দক্ষিণে কিজুনা গ্লোবালের জাপানি ভাষা শিক্ষা শাখার উদ্বোধন ইসলামী যুব আন্দোলন কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেন মতলবের মানসুর সাকি সৌদি আরবে নিখোঁজ ফরিদগঞ্জের প্রবাসী শাহিন, ৫ মাসেও মেলেনি সন্ধান প্রত্যাশা সামাজিক সংগঠনের আয়োজনে মৈশাদীতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, সেবা নিলেন প্রায় তিন শতাধিক মানুষ গজরা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে শাহ আলম লস্করকে সমর্থন জানালেন গ্রামবাসী মতলবে উদ্ধার হয়নি রবিন : স্বামীর সন্ধানে ঘাটে স্ত্রী, লঞ্চসহ আটক ২ লংমার্চে কেউ কেউ বক্তব্য দিয়ে ‘বাঘ’ সাজতে চান : মানিক এমপি হাজীগঞ্জ ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার পরও দোকান বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দোকান মালিক আতাউলের বিরুদ্ধে হাজীগঞ্জে শহীদ আল্লামা ফারুকী (রহ.) স্মৃতি মেধা বৃত্তির সনদ বিতরণ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অধিকারে বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগ, শিক্ষকসহ দুজনকে অব্যাহতি আল আমিন একাডেমি স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডি বাতিলের প্রতিবাদে চাঁদপুর আল-আমিন সোসাইটির সাংবাদিক সম্মেলন কাঁকৈরতলা জনতা কলেজে নবীনবরণ ও নতুন ক্লাসের উদ্বোধন ২৬ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরে ওয়াজ মাহফিলে আসছেন গিয়াস উদ্দিন আত-তাহেরী ইকরা মডেল একাডেমিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান হাজীগঞ্জের মোল্লা খোরে স্টেডিয়াম ও মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ার অপার সম্ভাবনা ভারতে পর্যটকবাহী বাসে ভয়াবহ আগুন, প্রাণ গেল ৯ জনের গুলশানে গাড়িচাপায় বাকপ্রতিবন্ধীর মৃত্যু, ৯ লাখ টাকায় আপস