পৃথিবীতে ২টি নদী আছে যেখানে সারাবছর খরস্রোতা (খরস্রোতা অর্থ প্রবল বেগে ধাবিত) ও নাব্যতা বজায় থাকে। তারমধ্যে একটি পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী ব্রাজিলের আমাজন, অন্যটি বাংলাদেশের মেঘনা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীরতম, প্রশস্ততম, অন্যতম বৃহৎ ও প্রধান নদী মেঘনা। এর দৈর্ঘ্য ১৫৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৪০০ মিটার এবং নদীটির গতি-প্রকৃতি অনেকটা সর্পিলাকার।
আসাম, ত্রিপুরার পার্বত্যভূমিতে উৎপন্ন বেশ কয়েকটি নদীর প্রবাহ বাংলাদেশে এসে মেঘনা নদীতে মিশেছে। মেঘনা নদী দেশের একমাত্র নদী যেটাতে একদিক থেকে পার্বত্য এলাকার পানি আরেকদিক থেকে হাওরের পানি এসে মেশায় প্রাকৃতিকভাবেই মেঘনার পানি অনেক বেশি বিশুদ্ধ ও সুমিষ্ট।
বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দূষিত মিঠাপানির উৎস হিসেবে মেঘনার খ্যাতি দীর্ঘদিনের। দেশের উৎপাদিত মাছের বিশাল একটা অংশ মেঘনা নদী থেকে আহরিত হয়।
মেঘনা নদী চাঁদপুরের মোহনা থেকে শুরু করেই সব থেকে বেশি খরস্রোতা হয়েছে এবং ভোলার শুরু থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের সাথে চট্রগ্রামের মাত্র ৯০ কিলোমিটার পথ বাচাতে মেঘনা নদীর উপর চাঁদপুর -শরীয়তপুর সেতু নির্মান করা হবে।
সারাবছর খরস্রোতা ও নাব্যতা বজায় থাকা দেশের একমাত্র নদী মেঘনার উপর যদি যাচাই-বাছাই ছাড়া পুরাতন রীতি অনুসারে সেতু নির্মাণ করা হয় তাহলে এর স্বাভাবিক গতিপথের ব্যপক ব্যাঘাত ঘটবে। খরস্রোতা ও নাব্যতা দুটো তো হারাবেই সেইসাথে মাছ উৎপাদন বিশাল হারে কমে যাবে এবং আশেপাশে বড় অংশ জুড়ে পলি মাটি জমে চর পড়বে। এখন যমুনা সেতুর নীচে যেমন চর পড়ে বালি খা খা করে, মেঘনা নদী উপর সেতু হলে এমনই ভাবে চর পড়লে অবাক হবার কিছু থাকবেনা।
যে কোন মেঘা প্রকল্প করার আগে খুব ভালো করে যাচাই-বাছাই করা উচিত। মেঘা প্রকল্পও যে সাদা হাতি অর্থাৎ বোঝা হয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ চট্রগ্রামে কর্নফুলী ট্যানেল।
সারাবছর খরস্রোতা ও নাব্যতা বজায় থাকা দেশের একমাত্র নদী মেঘনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। উন্নয়নের নামে চাঁদপুর-শরীয়তপুর সেতু যেন মেঘনা নদী ধ্বংসের কারণ না হয়।
আমি উন্নয়ন বিরোধী না, উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে কিন্তু সেটা দেশের নদী, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়। নদী, প্রকৃতি ধ্বংস হলে সেখানে মানুষসহ কোন প্রাণী বাসের উপযোগি থাকবেনা। এমনিতে দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু জায়গা বাড়ছেনা। এখন কোন ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া উন্নয়ন নামে যদি নদী, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হয় তবে দেশের প্রাকৃতিক অবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয় হবে।
মেঘনা নদীর উপর প্রস্তাবিত চাঁদপুর – শরীয়তপুর সেতু নির্মানণর আগে খুব ভালো করে যাচাই-বাছাই করা হোক।
যদি সেতু নির্মাণ করতেই হয় তবে লেটেস্ট প্ল্যান ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেতু এমনভাবে তৈরি করা হোক- যাতে মেঘনা নদীর খরস্রোতা ও নাব্যতা বজায় থাকে এবং মাছসহ অন্যান্য জীব বৈচিত্র্যের কোন ক্ষতি না হয়।