POPULAR BD NEWS
Popular BD News Logo

বইয়ের মাঝে বেঁচে থাকবেন মাহমুদুল বাসার

মনিরুজ্জামান বাবলু | প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২০ | সময়: ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

লেখক মাহমুদুল বাসার চলে যাওয়ার আজ তিন বছর। মাহমুদুল বাসার ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। ১৯৫৬ সালের ২৬ জুন ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আবদুল করিম মিয়া, মা মরহুমা লালমতি বেগম। ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় অপারেশন থিয়েটারে মারা যান তিনি।
১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মানসহ বাংলায় এম.এ পাস করেন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর চাঁদপুর জেলার নাসিরকোট শহীদ স্মৃতি কলেজ এবং হাজীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি রাজধানীর সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ জাতীয় পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কলাম ও প্রবন্ধ লিখতেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলোই গ্রন্থের মধ্যে সংকলিত হয়েছে। এতে প্রকাশ পেয়েছে তার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের সুগভীর বিশ্বাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে মাহমুদুল বাসারের লেখক সত্ত্বা।

প্রচারবিমুখ একজন লেখক ছিলেন। তিনি সবসময় নীরবে কাজ করে গেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি প্রাগ্রসর, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজের। তার লেখায় এর ছাপ স্পষ্ট। একজন মননশীল লেখক ছিলেন অধ্যাপক মাহমুদুল বাসার।

তিনি রাষ্ট্র এবং সাহিত্য নিয়ে ১০টিরও বেশি বই লিখে গেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে : বাংলাভাষা থেকে বাংলাদেশ, বঙ্গজননী ফজিলাতুননেসা, সিরাজদ্দৌলা থেকে শেখ মুজিব, জীবনশিল্পী জহির রায়হান, স্বকাল ও সমকাল, রবীন্দ্রনাথের ইংরেজ বিরোধিতা, বাংলাদেশের কথাসাহিত্য, সন্তোষ গুপ্ত : মুক্তচিন্তার প্রহরী, স্বাধীনতার স্থপতি, রেনেসাঁ যুগের বঙ্গের কিছু কথা এবং অতঃপর।

তিনি বিখ্যাত লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীকে নিয়েও বই লিখেছেন। তার প্রতিটি বই-ই অত্যন্ত মননশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জহির রায়হান, সন্তোষ গুপ্ত ও আবদুল গাফফার চৌধুরীকে নিয়ে তার কাজ অনবদ্য। আমার বিশ্বাস এই বইগুলোই লেখক মাহমুদুল বাসারকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

২০১২ সালে মাহমুদুল বাসারের বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন- ‘বাংলাদেশের কথা সাহিত্য বাংলা ভাষার কথা সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বলে আমি মনে করি। রবীন্দ্রনাথের কথা সবসময় মনে রাখি, ইংরেজ বাংলাদেশকে ভাগ করেছে কিন্তু বাংলা ভাষাকে ভাগ করতে পারেনি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হিসেবটা চর্যাপদ থেকেই আসে। আর বাংলা কথা সাহিত্যের ইতিহাস প্যারিচাঁদ মিত্র থেকেই শুরু হয়। হীন-কটিল-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি বাংলা ভাষার অখন্ড ধারাকে ছেদন করতে পারবে না। Ñএই চেতনা বুকে ধারণ করে কথা সাহিত্যের ওপর প্রবন্ধগুলো লিখেছি।’

মাহমুদুল বাসার আরো একটি প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিবিরোধিতা। তিনি সেখানে ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন- ‘যতগুলো প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম সংকলিত হয়েছে, তার অধিকাংশই জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়েছে। দুই একটা হয়তো ছাপা হয়নি। যেমন ‘ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আসামী’ নিবন্ধটি। বইটির প্রথম প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিবিরোধিতা’, সে জন্য এ নামকরণ। তাছাড়া আমি লেখালেখির ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মুক্তিবুদ্ধির চেতনায় বিশ্বাসী, প্রতিটি প্রবন্ধ-নিবন্ধে তার ছাপ আছে।

লেখা বিবেকেরই প্রতিধ্বনি, বিবেক তৈরি হয় সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে, আমিও আমার কালের প্রলয়-নৃত্যের মত ঘটনার দ্বারা প্রবাহিত হয়ে বিবেকের প্রতিধ্বনি করেছি। লেখাগুলো এরই নিরপেক্ষতা।

হয়তো নিরপেক্ষতা বলতে কিছুই নেই, কিন্তু লেখকদের দায়িত্ব সত্যোচ্চারণ করা, আমিও প্রতিটি লেখায় সত্য বলে যা জেনেছি, তাকে তুলে ধরেছি। বিকৃত ও জবরদস্তি বলে যা জেনেছি তাকে ঘৃণা করেছি। তার বিরোধিতা করেছি।’

প্রয়াত কলামিস্ট মাহমুদুল বাসার লিখেছেন ‘সিরাজউদ্দৌলা থেকে শেখ মুজিব’ নামে একটি প্রবন্ধ। সেখানে লেখক তার ভূমিকা উল্লেখ করেছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার আমি একজন অনুরাগী। এই চেতনাকে অবলম্বন করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালোরাতে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর বাঙালিত্বকে যেমন অস্বীকার করা হয়েছে, তেমনি বাঙালিয়ানার যাবতীয় উপাদান, ঐতিহ্যকে চুরমার করে দেবার রাষ্ট্রীয় প্রয়াস হয়েছে। সে প্রয়াস থামেনি। আমি সেই দুষ্কালের প্রহরে অনুসন্ধিৎসু হই, আমাদের বাঙালি লেখকদের মধ্যে বাঙালিয়ানাটা কেমন ছিলো? দীর্ঘ সময় ধরে নানা জনের ওপর লিখে পত্রিকায় ছাপি।’

মাহমুদুল বাসারের আরেকটি প্রবন্ধ ‘স্বাধীনতার স্থপতি’। বইটির শুরুতেই তিনি স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের প্রথম জেলে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। লেখক বঙ্গবন্ধুর জীবনের স্মৃতিচারণ তুলে ধরে প্রবন্ধের শুরুতে বলেছেন, ‘গোপালগঞ্জের স্কুলজীবনের বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির হাতেখড়ি। তখনই তিনি প্রথম কারাগারে যান। ষড়যন্ত্রের শিকার হন। অসাম্প্রদায়িক-মানবিক চেতনার উন্মেষ ঘটে তাঁর স্কুলজীবনেই।

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেখ শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের গোপালগঞ্জে সংবর্ধনা দেয়া নিয়ে যে হয় তাতে স্কুলছাত্র মুজিব নেতৃত্বশীল ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে, পুলিশের সাথে যোগসাজশ করে মামলা ঠুকে দেয়। বালক মুজিবের সাতদিনের জেল হয়। ঘটনাটি ঘটে ১৯৩৯ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯ বছর। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র।’

৬২ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন এই লেখক। তিনি রেখে গেছেন দশটি বই। তিনি ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর সোমবার রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আজগর আলী হাসপাতালে মারা যান। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তার স্ত্রী কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে রাজধানীর শ্বশুরালয়ের কবরস্থানে দাফন করা হয়। সামাজিক সংগঠনগুলোতে ছিল তার বিচরণ। তিনি হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, হাজীগঞ্জ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা, অণে¦ষার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায় সপরিবারে বসবাস করতেন। মৃত্যুর আগ-পর্যন্ত দৈনিক আমার সংবাদে চাকুরিরত ছিলেন।

সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। সরলতা তার চরিত্রের এক উজ্জ্বল দিক। তিনি ছিলেন সজ্জন ব্যক্তি। নীরবে তিনি আড্ডা উপভোগ করতেন। আমি মাঝে মাঝে লেখক মাহমুদুল বাসার স্যারের সাথে চায়ের আড্ডায় বসতাম। দেশের শিল্প সাহিত্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এ ব্যক্তিত্ব চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তার সৃষ্টি সম্ভার- যা অমূল্য সম্পদ। আজ মনে পড়ে, মন কাঁদে।

তিনি শখ করে কখনো জামা কিনেননি। তিনি শখ করে জুতা কিনেননি। তিনি কিনেছেন অসংখ্য বই। তার মৃত্যুর এক বছর পর যখন স্যারের বাসায় গিয়ে দেখলাম বইগুলো ওয়াশরুমের ছাদে ঠাঁই হয়েছে। তখন দুঃখটা আর মর্মটা আমাকে মর্মাহত করেছে। তার ছেলে সবুজের ইচ্ছেয় অসংখ্য বইগুলোকে নিজের আয়ত্বে আনলাম। আমার অফিসে সাজানো আছে মাহমুদুল বাসার স্যারের হাতে ছোঁয়ায় অজস্র বই। তিনি বেঁচে আছেন, থাকবেন বইয়ের মাঝে। বই পড়া হোক প্রজন্মের সাধনা।

লেখক : সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকর্মী। মোবাইল- ০১৭৫৬৪৬৯৫০৫

পপুলার বিডিনিউজ | বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশে দুরন্ত
কার্যালয়: কেনাকাটা মার্কেট, ৪র্থ তলা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৬-৪৬৯৫০৫ | ইমেইল: newspopular2020@gmail.com

© 2026 পপুলার বিডিনিউজ — অনুমতি ছাড়া লেখা/ছবি/ভিডিও ব্যবহার বেআইনি
প্রিন্ট করুন