২০১৬ সালে পরিবারের হাল ধরতে বিদেশ পাড়ি দেয়া হানিফ ভুঁইয়া ৫ মাস পরই দেশে ফিরেন। বাবার দেয়া ৩৫ হাজার টাকায় একটি গাভী ক্রয় করে শুরু করেন প্রান্তিক খামার। সেই গাভীর দেয়া ৬টি বাছুরের মধ্যে ‘ভুঁইয়া রাজ’ একটি। চার বছর আগে জন্ম নেয়া বাছুরটির শারিরিক গঠন দেখেই বংশের সাথে মিল রেখে নাম রাখা হয় ‘ভুঁইয়া রাজ’।
গেলো বছর চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ বাজারের কোরবানির হাটে দাম উঠে ৫ লাখ টাকা। নায্য দাম না পাওয়া এবার আট লাখ টাকায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জুম্মন খান বলেন, আমি এতো বড় গরু আমাদের এলাকাতে আর দেখিনি ‘ভুঁইয়া রাজ’র মতো। আর এখানে আসা যাওয়া করি সবসময়। ওনি যথেষ্ট পরিমাণ ভালো যত্ম করে। চার বছর ধরে এই গরুটা ওনি ঘরে লালন-পালন করে। ওনার ঘরের সবচেয়ে বড় গরু এটা। তাই এটার নাম দিয়েছে ‘ভুঁইয়া রাজ’।
মো. সোহাগ তফদার নামের আরেকজন বলেন, আসলে এলাকায় অনেক বলাবলি হচ্ছে এই বাড়ীতে একটা বড় গরু আছে। আমি আইসা আজকে দেখলাম সরাসরি। আসলে গরুটা দেখে অনেক মায়া লাগতেছে। এলাকার মানুষও বলে- এতো বড় গরু আর কখনও দেখেনি। গরুটি বিক্রয় হয়ে গেলে মায়া লাগবে।
গরুর মালিক হানিফ ভূঁইয়ার বাবা মো. শহিদ ভূঁইয়া বলেন, জন্মস্থান এখানে। ওনার মাও এখানে আছে। শখ কইরা ‘ভুঁইয়া রাজ’ নাম রাখছে। গত বছর ৫ লাখ মূল্য কইছে। এ বছর আট লাখ টাকা হলে বিক্রি করুম। যেখানে চার বছর পাললাম। এটার মায়া লাগবে না?
গরুটি নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন হানিফ ভুঁইয়া। বিক্রির কথা শুনলেই জল আসে চোখে, কষ্ট বাড়ে মনে। তবুও এবার আট লাখ টাকায় গরুটি বিক্রি করতে পারবে বলে আশাবাদী। গরুটির পিছনে খাবারের জন্য দৈনিক ১ থেকে দেড় হাজার টাকা ব্যায় করতে হয় এই খামারী।
গরুর মালিক হানিফ ভুঁইয়া বলেন, এই গরুটা আমি নিজে লালন পালন করছিলাম। তারপর ২০২৪ এ বিক্রি করতে পারি নাই, কিন্তু ২০২৫ এ বিক্রি করব আশা আছে। দাম চাইতেছি আমি ৮ লক্ষ টাকা। গরুটির জন্ম এই জায়গা আর আমরা ভূঁইয়া বংশের মানুষ। ওই হিসাবে এটার ‘ভুঁইয়া রাজ’ নামকরণ করা হয়েছে। চাঁদপুর আমি যত জায়গায় গরু দেখছি ইনশাআল্লাহ আমার গরুর চেয়ে বড় গরু নাই। এই গরুটা আমি চাঁদপুরের সেরা মনে করি।
তিনি আরো বলেন, জন্ম থেকেই আমি এই গরুটা লালন পালন করছি। আমার তিনটা সন্তান আছে। তিনটা সন্তান যেমন লালন-পালন করছি, ঠিক আমার এই গরুটা তেমন পালন করছি। আমি মনে করি আমার এই তিনটা সন্তানের সাথে সাথে এটাও একটা সন্তান ছিল। এটা চলে গেলে আমার মনে অনেক কষ্ট লাগবে। আমার অনেক দিন কষ্ট ভোগ করতে হবে। তারপরেও ছেড়ে দিতে হবে। কারণ গরুর ছয়টা দাঁত উঠছে। গরুর উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখি না। গরুটির পিছনে আমার দৈনিক প্রায় এক দেড় হাজার টাকা ব্যয় হয়। যেমন ১০ কেজি চিকন মোটা ভুসি যায়। তারপর আমার সয়াবিন ভুসি যায়। ডালের ভুসি, খইল, ভুট্টা, চালের গুড়া এগুলা মিলে মোটামুটি দৈনিক এদের পিছনে ১৫শ টাকার মতো খরচ হয়। যেমন এক বছরে হিসাব করছি প্রায় ২ লক্ষ টাকার মতো খরচ হইছে নিজের শ্রম ছাড়া।
তিন বছর ধরে ভুঁইয়া রাজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন পাশ্ববর্তী এলাকার পশু চিকিৎসা কর্মী। তিনি খামারের সবকটি গরুর দেখাশোনা করলেও এই গরুটির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখেন তিনি।
চাঁদপুর সদর উপজেলার ৫নং রামপুর ইউনিয়ন পরিষদের পশু চিকিৎসা কর্মী আহমেদ শরীফ বলেন, আমি নিয়মিত ওনার খামার দেখাশোনা করি। এবং ওনি যখন বলে এই গরুটা বড় করতে চাই- তখন আমি ওনাকে বুদ্ধি পরামর্শ দেই। প্রাকৃতিকভাবে ঘাস চাষে উপলব্দি করি। ওনি যাতে ঘাসের উপর গরুটাকে রাখে। এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্য উৎসাহিত করি। গরুর বয়স প্রায় ৪ বছর, আজকে তিন বছর এই গরুটাকে দেখাশোনা করতেছি। ওনার খামারে যতগুলো গরু আছে, সবগুলোর জন্য ওনাকে পরামর্শ দেই। যাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের মাধ্যমে গরুটাকে লালন পালন করতে পারে। গরুটার ওজন আনুমানিক দেড়টনের উপরে, বডি ওয়েট। আর বাজার মূল্য চেয়েছে আট লাখ টাকা।
‘ভুঁইয়া রাজ’ অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড় গরু। এটি চাঁদপুর জেলার শাহতলী ইউনিয়নের ভাটেরগাঁও গ্রামের ভুঁইয়া খামারে লালন-পালন হচ্ছে। এবার খামারে রেখে বিক্রি না হলে ঢাকার গাবতলী অথবা চট্টগ্রামে গরুর হাটে তোলা হবে বলে জানান গরুর মালিক।