ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধ্যাপক ড. জিয়া আহসান শুধু ধর্মই অবমাননা করেননি, উচ্চশিক্ষার প্রতিও চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। তার মতে, উচ্চশিক্ষিতরাই শুদ্ধভাবে সালাম দেওয়া এবং বিদায় নেয়ার সময় আল্লাহ হাফিজ বলে থাকে, যা জঙ্গিবাদের লক্ষণ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এই প্রচলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাহলে তো তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন- উচ্চশিক্ষা জঙ্গিবাদকে প্রমোট করছে। অথচ এক সময় এই জিয়া আহসানরা জঙ্গি-ধর্মান্ধ বা মৌলবাদী বলে গালি দেওয়ার সময় মাদ্রাসা শিক্ষিত লোকদের দিকে আঙ্গুল তুলতো।
আসলে এদের অধ্যয়ন, প্রাজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা এতটাই ঠুনকো যে, তারা নিজেদের দর্শনে পর্যন্ত স্থির থাকতে পারে না। এর কারণ কি জানেন? পৃথিবীর সকল ধর্ম ও ধর্মীয় আচারকে এরা গ্রহণ করতে পারলেও ইসলাম নিয়েই তাদের যতসব এলার্জি। ইসলামের বিধান ও এর সৌন্দর্য এবং কল্যাণ-মানবিকতা আড়াল করতেই ওরা কুফরি মতবাদ ধর্মনিরপেক্ষতা আমদানি করেছে।
ইসলামের এসব শত্রুদের বিজাতীয় প্রভুরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিকতায় ইসলামের সার্বজনীন অবস্থান, শান্তি ও কল্যাণ এবং মানবিকতার সোহার্দ্য-সম্প্রীতি ও সৌন্দয্যের বিষয়ে আসলে ওয়াকিবহাল রয়েছে। তাই বিজাতীয়রা তাদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও শয়তানি শক্তির উপাসনায় ইসলাম যাতে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়াতে পারে সেজন্য ইসলামের প্রসার ঠেকাতে নানা ফন্দি সেই আদিকাল থেকেই আঁটছে। ফলে সমকালীন বিশ্বেও ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ তাদের সৃষ্টি। এর মূল কারণ, যাতে পৃথিবীর মানুষের কাছে ইসলামের দর্শন ও এর সু-মহান বাণি ভুলভাবে উপস্থাপণ করা যায় এবং ইসলাম একটি অমানবিক ধর্ম তা প্রমাণ করা যায়।
এ জন্য মুসলিমদেরই দুটি অংশকে তারা ব্যবহার করছে। এক অংশ ইসলামের পরিপূর্ণ বিধান ও রাসুল (সা.) এর সুন্নাহকে (রাসুলের নীতি, কর্ম, বাণি ও তার সিরাত বা আদর্শ) না বুঝে ইসলামের শত্রু ও তাদের এজেন্টদের খপ্পরে পড়ে মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী দীক্ষা নিয়ে মানুষের প্রতি জুলুমে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, যা ইসলামী শরিয়তে বিন্দু পরিমাণও সমর্থন করে না।
আর অপর অংশ (তারাও মুসলমান নামধারী) তাদেরও ইসলামের মৌলিক জ্ঞানই নেই, এদের দিয়ে ইসলাম ধর্মের মৌলিক অনুসারী, দল ও গোষ্ঠিকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে বিশৃঙ্খলাকারীদের কাতারে নিয়ে যাবার মিশন পরিচালনা করছে।
এদের মধ্যে আবার কিছুটা লিবারেল শ্রেণি আছে। যারা নামাজ পড়ে, রোজাও রাখে। সামর্থবানরা হজ্জ করে, কোরআনও পাঠ করে। নবী সা. এর প্রতিও ভক্তিশ্রদ্ধা কম নয়। কিন্তু ইসলামী শরিয়াভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার কথা যারা বলেন বা তা শুনলেই ঘাড় বাকা করেন, মৌলবাদের গন্ধ শুকেন। মানে আল্লাহর বিধানের এক অংশ মানেন, আরেক অংশ মানতে চান না। এ বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কোরআনেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তোমরা কি এক অংশ মান, আর এক অংশ মান না?
অথচ মহান আল্লাহ সোবাহনাহু তাআলা ইসলামকে শুধু ধর্ম এবং নবীকে (সা.) শুধু ইসলাম ধর্মের প্রচারক করে পৃথিবীতে পাঠাননি। গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য ইসলামই যে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান তার বাস্তব উদাহরণ ও প্রতিচ্ছবি ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মানবিক রাজনৈতিক লিখিত সমঝোতা চুক্তি মদিনা সনদের রূপকার হলেন নবী (সা.)। তিনি সংগঠক ও সমাজতাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী, প্র্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন এবং এতিম-মিসকিন ও অসহায়দের জন্য রহমতস্বরূপ ছিলেন। তিনি ভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও আমানতদার ছিলেন। কীভাবে এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদা ও সম্প্রীতির মাধ্যমে সহাবস্থান করা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন। একজন দক্ষ কূটনীতিক ছিলেন। নবী (সা.) সর্ব যুগ ও কালের একজন শ্রেষ্ঠ সমরবিদ ছিলেন। তিনি একটি যুদ্ধেও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার নজীর নেই। বরং শত্রুপক্ষ আক্রমণ বা আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে কেবল প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছেন। তাকে অনুসরণ করে পরবর্তীতে ইসলামের চার খলিফাও পৃথিবীর বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।
অথচ মুর্খ, গর্দভ ও জ্ঞানপাপীরা বলেন, ইসলামে রাজনীতির কোনো স্থান নেই। ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা। একই ভাবে জঙ্গিরা নিরাপদ মানুষের ওপর হামলা-হত্যা করে কথিত ইসলামি খেলাফত কায়েম করতে চায়। তাই এই দুই শ্রেণিকে বলবো, প্লিজ আপনার আপনাদের অজ্ঞতা দূর করুন। ইসলাম ও এর বিধিবিধানকে জানার চেষ্টা করুন।
দেখুন, ভারতে হিন্দুইজমের ভিত্তিতে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পাটি) রাজনীতি করছে- তাদের মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদ বলছে না জিয়া আহসানরা। বরং তাদের আনুকুল্য পাওয়ার জন্য যারপরনাই ঘুমকে এক প্রকার হারাম করে ফেলেন তারা। ইটালির ভ্যাটিক্যান সিটিকে খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় সর্বোচ্চ গুরু পপ- এর জন্য আলাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়ে তাকে খেলাফতের দায়িত্ব দিলেও খ্রিস্টীয় মৌলবাদ নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই এদের কারও। পপ যেকোনো দেশে গেলে রাষ্ট্রীয় প্রধানের প্রটোকল পান। আবার ইহুদিরা তাওরাতের পর আসমানি কিতাব ইঞ্জিল, কোরআন নাজিল হলেও তাওরাতকে একমাত্র আসমানি কিতাব মনে করেন।
অথচ এই তাওরাত কিতাবকেও তারা খন্ডিত-বিকৃত করেছে। এছাড়া নবী ইসা (আ.) এবং শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদকে (সা.) অস্বীকার করে ইহুদিরা তাদের দর্শন সারা পৃথিবীতে প্রমোটের চেষ্টা করলেও তথাকথিত সেক্যুলার মুসলিমদের গা-জ্বালা নেই। তাদের যত মাথা ব্যাথা ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতি নিয়ে।
জাকির মজুমদার: সাংবাদিক, কলাম লেখক, সমাজকর্মী
ও
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, হাজীগঞ্জ পৌর বিএনপি