বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় হলেও ইলিশ উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে। বিশ্বের ইলিশ উৎপাদনের ৭৫ শতাংশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ইলিশ আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ। এই মাছ একদিকে যেমন জীবন-জীবিকার পথ, আবার অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যের প্রতীক। বাঙালিদের আতিথিয়তায় ইলিশ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এই সম্পদ রক্ষায় দেশের প্রতিটি নাগরিকের এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। ইলিশের সহনশীল উৎপাদন বজায় রাখার লক্ষ্যে ডিমওয়ালা মা-ইলিশ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-ইলিশ রক্ষা পেলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
মা-ইলিশের সুরক্ষা এবং প্রজনন মৌসুমে ইলিশের ডিম ছাড়া নির্বিঘ্ন করতে বিগত বছরের মতো এ বছরও মা-ইলিশ রক্ষায় গত ১৩ অক্টোবর হতে আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সমগ্র দেশে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময় ইলিশ শুধু শিকারই নয়, বিক্রির জন্য হাটবাজারে তোলা বা সংরক্ষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলেরা এই নিষেধাজ্ঞাকে তোয়াক্কা করছে না। বিগত বছর গুলোতেও দেখা গেছে, মা-ইলিশ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে মা-ইলিশ সংগ্রহ করে যা ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য বড় বাধা।
প্রতিবার মা-ইলিশ ও জাটকা নিধনবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযানগুলো পরিচালিত হচ্ছে ব্যাপক উৎসাহ ও পরিকল্পনা নিয়ে। উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, প্রশাসন, পুলিশ, মৎস্য কর্মকর্তা, কোষ্টগার্ড, নেভি, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের হাজারো কর্মচারী অভিযান পরিচালনা করছেন। তারপরও অসাধু জেলেদের মা-ইলিশ সংগ্রহ থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। ইলিশ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। আমরা আমাদের এই আশীর্বাদ হেলায় ফেলে দিতে পারি না? তাই ইলিশ রক্ষায় সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানতে হবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও আইন।
এদিকে মা-ইলিশ রক্ষায় প্রণোদনা বাবাদ জেলে পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছে মৎস্য বিভাগ। তারপরও মা-ইলিশ নিধন কেন বন্ধ হচ্ছে না? মা-ইলিশ নিধন বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত ও লাগাতার অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। কিন্তু পদ্মা নদীর বিশাল এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। জনবলের অভাবে যখন একদিকে অভিযান চলে, তখন অন্যদিকে জেলেরা মা-ইলিশ শিকার করা শুরু করে দেয়। এজন্য নিরবিচ্ছিন্ন ও সার্বক্ষণিক মা-ইলিশ রক্ষার জন্য অভিযান পরিচালনা করতে যে পরিমাণ লোকবল ও নৌযান প্রয়োজন, সেগুলো মৎস্য বিভাগের থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া যারা জেলে নয়, অন্য পেশায় আছেন, তারা যেন বিভিন্ন উপায়ে জেলে সেজে তালিকায় নাম লিখে অনুদান নিয়ে না যান, তাহলে প্রকৃত জেলেরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে ক্ষুধার তাড়নায় নদীতে নেমে পড়েন। এটা খুবই দুঃখজনক। স্থানীয় প্রশাসনকে এই বিষয়টি নজরদারি করা খুবই জরুরি। নিয়ম ভঙ্গ করে যেসকল জেলে মাছ ধরতেছেন তাদের ভিজিএফসহ অন্যান্য সুবিধা বাতিল এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।
মা ইলিশের সঠিক প্রজননের লক্ষ্যে জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় বরাবরের মতো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর শাস্তির ভয়ে নয়, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে দেশের এ মূল্যবান সম্পদ রক্ষায় সবাই স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে হবে। এতে করে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে পরিচিত ইলিশের হারানো গৌরব “মাছে ভাতে বাঙালি” ফিরতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। এজন্য মাঠ প্রশাসনের সুষ্ঠু তদারকির পাশাপাশি কঠোর নজরদারি করা যেমন দরকার ঠিক একই সাথে ক্রেতা, বিক্রেতা ও জেলেদের সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি। মা-ইলিশ রক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক, এটি দেশের অর্থনীতি ও আমিষের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায়, ইলিশ সম্পদ রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে কালোবাজারি রোধ করে ইলিশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং তদসংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ করছি।
লেখক: মোঃ রনি, শিক্ষার্থী, বিবিএ (অনার্স) হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।