POPULAR BD NEWS
Popular BD News Logo

স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ প্রতিবেদন

যেভাবে চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম

পপুলার বিডিনিউজ ডেস্ক - চাঁদপুর | প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৪ | সময়: ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতেই নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে মসনদে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানিরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দিতে শুরু হয় করে টাল–বাহানা। এর মধ্যে ৩ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু ১ মার্চ সেই অধিবেশন বাতিল করা হয়।

ফলে ২ মার্চ ঢাকায়, আর ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল ডাকেন বঙ্গবন্ধু। ৩ মার্চ হরতালের মধ্যেই বাঙালিদের একটি প্রতিবাদী মিছিল হয় চট্টগ্রামে। সেই মিছিলে বেসামরিক পোশাকে সামরিক অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় চট্টগ্রামে থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের একটি গ্রুপ। তাদের হাতে ছিল যুদ্ধে ব্যবহৃত সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু রাইফেল। সেই মিছিলে চালানো নির্বিচার গুলিতে শতাধিক প্রতিবাদকারী নিহত হন। সেই ঘটনার পর চট্টগ্রামে থাকা বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ধারণা স্পষ্ট হয় যে, পাকিস্তান হয়তো খুব শিগগিরই বাঙালি গণহত্যায় নামবে।

এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে সেনাবাহিনীর জন্য বিপুল পরিমাণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ভেড়ে পাকিস্তানি জাহাজ সোয়াত। এতে প্রায় ১০ হাজার টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল। এই দুই ঘটনাই বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের প্রবল নাড়া দেয়। এই অস্ত্র যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে, এতে আর কোনো সন্দেহই ছিল না।

সে সময় চট্টগ্রামে সেক্টর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে ডেপুটেশনে যাওয়া বাঙালি কর্মকর্তা মেজর রফিকুল ইসলাম। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল ২০২০ সালে। বীর উত্তম খেতাব পাওয়া এ সেনা কর্মকর্তা পরে মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনিই। মে মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে।

সোয়াত জাহাজে অস্ত্র আসা নিয়ে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বাঙালি শ্রমিক, যারা চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করে এবং জাহাজ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ নামায়, তাদের মধ্যে আমরা (আমাদের শঙ্কার কথা) ছড়িয়ে দিলাম। তারা বলল, “যে অস্ত্র দিয়ে আমাদের মারবে, যে অস্ত্র গোলাবারুদ আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে—আমরা সেগুলো নামাব না।” তখন একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেল। আমরা সোয়াত থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ নামাতে বাধা দিলাম, শ্রমিকদের মাধ্যমে।’

এখানেই শেষ নয় মেজর রফিক তখন সেনাবাহিনীর অন্যান্য রেজিমেন্টে থাকা বাঙালি কর্মকর্তদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু করলেন। সে সময় ইপিআরের ৭৫ ভাগ সৈনিকই ছিলেন বাঙালি। কিন্তু ২৫ ভাগ অবাঙালির দাপটে তাঁরা ছিলেন কোণঠাসা। এই সুযোগটিই কাজে লাগালেন মেজর রফিক। বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন মুক্তির স্বপ্ন। প্রাথমিক লক্ষ্য ঠিক হলো চট্টগ্রাম অঞ্চলে থাকা অবাঙালি সেনাদের আক্রমণ করে ধ্বংস করা। চট্টগ্রামকে মুক্ত রাখাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।

মেজর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে, বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায়, বড় ভবনে আমাদের মেশিনগান বসানোর পরিকল্পনা হলো। মর্টার, অ্যান্টি ট্যাংক—যত অস্ত্র আছে, সেগুলোও বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলো। এমন পরিকল্পনা করলাম, যাতে বন্দরে থাকা সৈন্যরা বেরিয়ে আসতে না পারে, আর ক্যান্টনমেন্টে থাকা সেনারাও যেন শহরের দিকে আসতে না পারে। এ ছাড়া ফেনীর মহুরী নদী, ফেনী নদী—যেটা শুভপুর দিয়ে মহুরীর সঙ্গে মিলেছে—এ দুটো অঞ্চলে ডিফেন্স নিলে ঢাকা-কুমিল্লা থেকে কোনো সৈন্য চট্টগ্রামে আসতে পারবে না। এ কৌশল ঠিক রেখে মূল পরিকল্পনা সাজালাম।’

সে সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছিলেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ ইপিআর সদস্য। এদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন ছিলেন বাঙালি। অবাঙালিদের বেশির ভাগের অবস্থান ছিল চট্টগ্রাম শহরে। আর অবশিষ্টরা ছিলেন সীমান্তের নানা পোস্টে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সে সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল হালি শহরে ইপিআর সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। এখানে তখন প্রায় ২৫০ অবাঙালি সেনা সদস্য ছিল। চ্যালেঞ্জ ছিল—এ অবাঙালি সৈন্যদের ধ্বংস করা। কিন্তু এও চ্যালেঞ্জ ছিল—আক্রমণ এমনভাবে করতে হবে, যেন একটি গুলির শব্দও শোনা না যায়। কারণ আশপাশে সব অবাঙালির বাস। তারা বুঝে ফেললে ক্যান্টনমেন্টেও খবর দিতে পারে।’

মেজর (অব.) রফিক এ সময় সহযোগিতা পান তাঁর বিশ্বস্ত ইপিআর সদস্য সুবেদার জয়নাল, হাওয়ালদার ওয়াদুদ, হাওয়ালদার সিরাজুল ইসলাম ও আরও কয়েকজন জেসিওর। আক্রমণ পরিকল্পনা সাজাতে ছক তৈরি হলো। কোন কোম্পানি, কোন প্লাটুন কোন জায়গায় অবস্থান নেবে, সেটাও ঠিক হলো। সীমান্তে অবাঙালি সৈন্যদের কিভাবে বন্দী করা হবে, তারও এটা ছক তাঁরা তৈরি করলেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাদেরকে একটি সাংকেতিক বার্তা দিয়ে দিলাম, যেটি থেকে তারা যুদ্ধ শুরুর সংকেত পাবে। একটি ছিল—“অ্যারেঞ্জ সাম উড ফর মি”; এর অর্থ—“প্রস্তুতি নাও আধা ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু করতে হতে পারে”। আর দ্বিতীয়টি ছিল—“ব্রিং সাম উড ফর মি”; অর্থাৎ, “সীমান্তে তোমার অবস্থানে যত অবাঙালি সৈন্য আছে তাদের ধ্বংস করো এবং শহরে এসে নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নাও”।’

নিজের যুদ্ধ পরিকল্পনায় রাজনৈতিক নেতাদেরও সাথে রেখেছিলেন মেজর (অব.) রফিক। এর কারণ ছিল, সেনা সমর্থনের পাশাপাশি তাঁর জনসমর্থনও প্রয়োজন হবে। একপর্যায়ে পারিবারিক বন্ধু চোখের চিকিৎসক ডা. জাফরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম আর সিদ্দিকী সাহেব, এম এ হান্নান, জহুর আহমেদ সাহেবসহ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

সে সময় চট্টগ্রামে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন বেশির ভাগ বাঙালি সেনারা। তাঁদের অফিসারদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগই ছিলেন বাঙালি। তাঁদের অবস্থান ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। এই রেজিমেন্টের অফিসার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, শসসের মবিন চৌধুরী। এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন মেজার জিয়া।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মার্চের ১২ বা ১৩ তারিখে প্রথম জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করি এবং তাঁকে পুরো জিনিসটা বুঝিয়ে বলি। আমি তাঁকে বললাম, আমি একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছি, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি যেন তার সৈন্য নিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টে যান এবং সেখানে যে বাঙালি সৈন্যরা আছে, তাদের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেন, যেন সেখানে থাকা বেলুচ রেজিমেন্টকে ধ্বংস করা যায়। এতে ক্যান্টনমেন্ট আমাদের দখলে আসবে আর ২ হাজার সেনাও আমরা পাব। জিয়াউর রহমান সেদিন আর কোনো মন্তব্য করলেন না।’

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ; সারা দেশ উত্তপ্ত। সকলের কাছেই তখন পরিষ্কার—স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির সামনে মুক্তির আর কোনো পথ নেই। এ পরিস্থিতিতে আবারও জিয়াউর রহমানে সঙ্গে যোগাযোগ করলেন মেজর রফিক। তাঁদের বৈঠক হলো নাসিরাবাদে জিয়াউর রহমানের বাসায়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তাঁকে বললাম, আমার প্রস্তুতি শেষ। আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইপিআরসির একজন কর্নেল ছিলেন কর্নেল চৌধুরী, তিনি ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আমি বেশ কয়েকটি গোপন বৈঠক করি। আমি ভেবেছিলাম, যেহতু জিয়াউর রহমান একজন বাঙালি অফিসার, তাঁর ওপর পাকিস্তানিরা নজর রাখতে পারে। তখন আমি রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে অন্য অফিসারদের খবর দিলাম। ক্যাপ্টেন অলি, খালেকুজ্জামান—আমরা সব একসঙ্গে হওয়ার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আলম সাহেবের বাসায় বৈঠকের সিদ্ধান্ত হলো। সেখানে তাঁদের সব বোঝালাম, পরিকল্পনা জানালাম। তাঁরাও একমত হলেন এবং আমরা একসঙ্গে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলাম।’

‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে কী করতে চেয়েছিলেন রাও ফরমান আলী‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে কী করতে চেয়েছিলেন রাও ফরমান আলী
২৪ মার্চেই ব্রিগেডিয়ার আনসারি চট্টগ্রাম ব্রিগেডের দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি চলে যান চট্টগ্রাম বন্দরে। সেখানে গিয়ে নির্দেশ দেন, যেকোনো মূল্যে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের। প্রথমে শ্রমিকরা অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানালেন। পরে ইপিআর সদস্যদের দিয়ে অস্ত্র নামানোর চেষ্টা করা হলে তাঁরাও অস্বীকৃতি জানান। ফলে সেসব শ্রমিক ও ইপিআর সদস্যদের গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের মরদেহ একটি গানবোটে করে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় গভীর সমুদ্রে। সেই রাতেই আক্রমণ শুরুর সিদ্ধান্ত নেন মেজর রফিক।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রেল পাহাড়ে তৈরি করা হলো হেড কোয়ার্টার। মেজর রফিক বলেন, ‘এখান থেকে ফোনে হালি শহরে সুবেদার জয়নালকে রেডি রেখেছিলাম আগে থেকেই। তাঁকে বললাম—“কোড ম্যাসেজ দুটো এখনই পাঠিয়ে দিন।” তখন টেলিফোন লাইন সব জায়গায় ছিল না। তাই ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হলো।’

রফিকুল ইসলাম সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তখন ৬টা সাড়ে ৬টা বাজে। এদিকে জিয়াউর রহমান সাহেব আমার বাসায় ফোন করলেন। আমাকে ফোনে না পেয়ে রেল পাহাড়ে আমার অবস্থানে তিনি ও কর্নেল চৌধুরী আসলেন। ওনারা প্রথমেই জানতে চাইলেন, কী হচ্ছে? আমি জানালাম যা হচ্ছে। আর বললাম, আমি যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি, তাঁরাও যেন শুরু করেন। তখন জিয়াউর রহমান ও চৌধুরী সাহেব বললেন, “তুমি যে যুদ্ধ শুরু করলে, আমরা তো এই মুহূর্তে নামতে পারছি না। কারণটা হলো, এখনো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের আলোচনা চলছে।” আমি যুক্তি দিলাম, “ব্যর্থ হলে আপনার-আমার অ্যাকশন নেওয়ার সময় থাকবে না। ঢাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে, সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে, আপনি আমি বাঁচতে পারব না।” তারপরেও তাঁরা বললেন, “আজকে রাতে করা ঠিক হবে না, আমরা এ মুহূর্তে প্রস্তুত না।”’

মেজর জিয়া ও কর্নেল চৌধুরী যুদ্ধ শুরু করতে দোটানায় পড়ার পর মেজর রফিকের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। তিনি এরই মধ্যে তাঁর সেনাদের যুদ্ধ শুরুর বার্তা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত এলাকার বেশ কয়েকটি চৌকি দখলে নিয়েছে বাঙালিরা। মেরে ফেলা হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেককেই।

মেজর (অব.) রফিক বলেন, ‘আমি আবার সুবেদার জয়নালকে ফোন করে বললাম, “দ্বিতীয় বার্তা স্থগিত করেন।” কিন্তু প্রথম বার্তাটি রেখে দিলাম। অর্থাৎ, প্রারম্ভিক যে বার্তা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ কর—সেটি রেখে দিলাম। এরপর জিয়াউর রহমান সাহেবরা চলে গেলেন। যাওয়ার আগে আমি তাঁদের বললাম, “আপনাদের এ ভুল সিদ্ধান্তের জন্য কিন্তু মাসুল দিতে হবে।”’

২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ মেজর রফিক জানতে পারলেন ঢাকায় পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ব্যার্থ হয়েছে। এর পরপরই ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন। ইয়াহিয়া খান ও তাঁর উপদেষ্টারা পশ্চিম পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন।

মেজর (অব.) রফিক বলেন, ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পশ্চিমা সেনারা তাদের সামরিক পোশাক পরে নিয়েছে, তাদের ট্যাংকগুলোতে আগে থেকেই রাবার ট্যাগ লাগানো হয়েছে। সেগুলোতে মেশিনগান বসানো হচ্ছে। সৈন্যরা অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে যানবাহনে উঠেছে। এ খবর পেয়েই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতারা গোপন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তারা বার্তা পাঠিয়েছেন, “নাউ ইট ইজ ইউর শো।”’

এ পরিস্থিতিতে আবারও হালিশহরে থাকা সুবেদার জয়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন মেজর রফিক। আগে স্থগিত করা দ্বিতীয় বার্তা; অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরুর বার্তা দিলেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হালিশহরে আমার যে ছক তৈরি করা আছে, সে ছক অনুযায়ী অস্ত্রাগার আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যানবাহনগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওয়্যারলেস সেন্টারে পুরোটা বাঙালি অপারেটর নিয়ে রেখেছিলাম আমি। অ্যাডজুটেন্ট হওয়াতে এটা আমার সুবিধা ছিল। এ দায়িত্বগুলো আমার মতো করে ভাগ করে দিতে পারতাম। কাজেই যুদ্ধ যখন চূড়ান্তভাবে শুরু হলো হালি শহরে সব জায়গায় খালি বাঙালি সৈন্য। আমরা কৌশলে সব অবাঙালি সৈন্যদের বন্দী করলাম। হালি শহরে আমাদের হেড কোয়ার্টারে তিন–চারটা বড় বড় রুমে হাত বেঁধে আটকে রাখলাম।’

নিজের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে মেজর রফিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে ষোলশহরে জিয়াউর রহমানের কাছে যুদ্ধ শুরুর বার্তা পাঠালেন। কিন্তু সেই সময় জিয়াউর রহমান তাঁর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়ার নির্দেশে চলেছেন সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস করে আনতে। পরে অবশ্য অন্য বাঙালি কর্মকর্তারা জিয়াউর রহমানকে বার্তা পৌছে দেন এবং তিনি ফিরে আসেন।

মেজর রফিক বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল—জিয়াউর রহমান তাঁর সৈন্য নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাবেন এবং ক্যান্টনমেন্টের উল্টো দিকের পাহাড়ে অবস্থান নেবেন। আর ক্যান্টনমেন্টে থাকা বেলুচ রেজিমেন্টের ওপর গুলিবর্ষণ করবেন। বেলুচ রেজিমেন্ট ডিফেন্সে গেলে বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সংগঠিত করবেন কর্নেল চৌধুরী। তাঁরা বালুচ রেজিমেন্টকে ধ্বংস করবেন, বন্দী করবেন এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ফেলবেন। এতে ক্যান্টনমেন্ট তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ রকমই কথা ছিল।’

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিন্তু জিয়াউর রহমান সাহেব কোনো অজ্ঞাত কারণে ক্যান্টনমেন্টের দিকে না গিয়ে শহর ছেড়ে চলে গেলেন, কালুরঘাট রেলওয়ে ব্রিজ হয়ে কক্সবাজারের রাস্তায়। এদিকে, আমার ম্যাসেজ পেয়ে কক্সবাজার, বান্দরবান, কাপ্তাই, রাঙামাটি থেকে সৈন্যরা শহরের দিকে আসা শুরু করে। কাপ্তাই থেকে ক্যাপ্টেন হারুন তাঁর সেনাদের নিয়ে আসার পথে দেখেন বাঙালি সৈন্যরা শহর থেকে কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছে। তখন কথা বললে সৈনিকেরা তাঁকে জানায়, শহরে কেউ নাই। তখন ২৬ মার্চ খুব সকাল। হারুন তখন বুঝতে পারছিল না কী করবে। তখন সেও ভুলে কক্সবাজারের দিকে চলে যায়। এদিকে কক্সবাজার থেকে যে সৈন্যরা আসছিল, সুবেদার মফিজ, গনি মিয়া ওরাও দেখে শহর থেকে চলে যাচ্ছে জিয়াউর রহমানের গ্রুপ। তাদেরও বলা হলো শহরে কেউ নাই। বিভ্রান্ত হয়ে তারা তাদের সঙ্গেই থেকে গেল। এতে আমি হারুনের গ্রুপটাকে পেলাম না, কক্সবাজারের গ্রুপটাকে পেলাম না।’

পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ নেতাদের বাধায় জিয়াউর রহমান রামু তেকে কালুরগাটে এসে অবস্থান নেন। তবে তাঁরা আর চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাননি। এমন সময় কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে বাঙালি অফিসার মেজর বাহারের বার্তা পেলেন মেজর রফিক। জানানো হলো ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি তাঁর ব্রিগেড নিয়ে চট্টগ্রাম রওনা হয়েছেন। সেই সেনা দলটির সঙ্গে ছিল আর্টিলারি কামান, মর্টার রেজিমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়ান, আর কিছু কমান্ডো। মেজর রফিকও অ্যাম্বুশের জন্য হালিশহর থেকে দুটি রিজার্ভ কোম্পানিকে পাঠালেন।

২৬ মার্চ বিকেল ৫টায় ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির পুরো কনভয়টা বাঙালি সেনাদের অ্যাম্বুশের মধ্যে পড়ল। মেজর রফিক বলেন, ‘সামনের দিকে প্রায় ১৫ থেকে ২০টা গাড়ি। এখানেই ইকবাল শফি, দুই ব্যাটালিয়ন কমান্ডারসহ অফিসাররা ছিলেন। তাঁরা ধারণাও করতে পারেননি চট্টগ্রাম আমরা টেকওভার করেছি। আমাদের পক্ষে সুবেদার মুসা তাঁর কোম্পানি নিয়ে প্রচণ্ড মর্টার শেলিং করল, মেশিনগান ফায়ার করল, তাদের অনেকগুলো যানবাহন ধ্বংস হয়ে গেল।’

ইপিআর সদস্যদের এই অ্যাম্বুশে পাকিস্তান বাহিনীর একজন কর্নেল নিহত হন। সেদিন আরও কয়েকজন অফিসারসহ মোট নিহত হয় ৭২ জন। ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর চট্টগ্রাম শহরে ঢোকার পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়। অবশ্য এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বেলুচ রেজিমেন্ট। ২৫ মার্চ রাতেই সেখানে থাকা প্রায় ১ হাজার সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। মারা যান কর্নেল চৌধুরীও।

অন্যদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী যে সেনারা মেজর রফিকের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা হলো না। এরপরও পরবর্তী ২ মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন মেজর রফিক। তিনি বলেন, ‘২ মে, আমাদের লাস্ট হোল্ড রামগড়ে প্রচণ্ড যুদ্ধ করার পরে আমরা ভারতীয় অঞ্চলে ফলব্যাক করি। সেখানে পুনর্গঠনের কাজ চলে। অন্য জায়গাগুলোতেও কিন্তু যারা ছিলেন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছে। যেমন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া এলাকায় খালেদ মোশাররফ সাহেব, শাফায়েত জামিল সাহেব তাঁরা করেছেন। জয়দেবপুর এলাকায় শফিউল্লাহ সাহেব, কর্নেল মঈন, নর্থ বেঙ্গলে ক্যাপ্টেন নজরুল, রাজশাহীতে ক্যাপ্টেন গিয়াস—তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এককভাবে সব হয়নি।’ সূত্র: ইনডিপেন্ডন্ট টেলিভিশন/ আইটিভি ডটকম

পপুলার বিডিনিউজ | বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশে দুরন্ত
কার্যালয়: কেনাকাটা মার্কেট, ৪র্থ তলা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৬-৪৬৯৫০৫ | ইমেইল: newspopular2020@gmail.com

© 2026 পপুলার বিডিনিউজ — অনুমতি ছাড়া লেখা/ছবি/ভিডিও ব্যবহার বেআইনি
প্রিন্ট করুন