ট্রেন দুর্ঘটনায় পা হারানো তাফাজ্জ্বল। এক পায়ে ভর করে কৃষি কাজকে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। সংসারে চার ছেলে। সবাই কৃষিকাজে নির্ভর। এক মেয়ে জান্নাত। সে পড়াশোনা করছে ডিগ্রিতে। পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন জান্নাত। সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়েছে। গেলো বৃহস্পতিবার মৌখিক পরীক্ষায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হয়। দিনশেষে সন্ধ্যায় চাঁদপুর পুলিশ লাইনসে জান্নাত ও তার বাবা তাফাজ্জলকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ পিপিএম।
ওই অনুষ্ঠানে শুধু জান্নাতকে নয়, আরো ৯২ জনকে প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত করেন জেলা পুলিশ বিভাগ। সবাইকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করে নেন জেলা পুলিশ সুপার।
জানতে চাইলে জান্নাতের বাবা তাফাজ্জল হোসেন কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, পুলিশে চাকরী পাবে মেয়ে এটা আমাদের স্বপ্নের মতো। কেউ সুপারিশ বা ঘুষ দেয়ার মতো কোন অবস্থা নেই আমাদের। কিন্তু মাত্র ১০০ টাকায় ফরম কিনে মেয়ে চাকরী পেয়েছে। পুলিশের সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
চোখে জল মুছতে মুছতে জান্নাত বলেন, বাবা আগে কলেজ ঘাটে নৌকার মাঝি ছিল। তারপর ট্রেন পা হারায়। পরিবারে শুধু আমি পড়াশোনা করেছি। দারিদ্রতাকে জয় করে আজ প্রথম হয়ে চাকরী পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
জান্নাতের বাবার বাড়ী চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড রামচন্দ্রপুর গ্রামে।
সাইফুর রহমান। বাবা প্রবাসী। দুই ভাই এক বোন। অনূভুতি প্রকাশ করতে গিয়ে সে জানায় পুলিশে চাকরী পেতে কাউকে এক কাপ চা ঘুষ খাওয়াতে হয়নি। তাই নিজেও কখনও পুলিশে ঘুষ খাবে না। পুলিশ নিয়ে মানুষের যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া আছে। চাকরী জীবনে তা পাল্টে দেয়ার ভূমিকায় কাজ করবে।
অটোরিকশা চালক রুহুল আমিন। তার ছেলে মিলন পুলিশে চাকরী পাওয়া খুশি। অভিমত ব্যাক্ত করতে গিয়ে বলেন, ঘুষ ছাড় ছেলে চাকরী পেয়েছে। পরিবারে বা বংশে এই প্রথম সরকারি চাকরি পেলো তার ছেলে। সেজন্য পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
ঘুষ বা তদবির ছাড়া চাকরী পাওয়ায় এভাবে পুলিশ বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অভিভাবকেরা।
চাকুরি নয়, সেবা এই স্লোগানকে সামনে রেখে চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ পিপিএম বার এর সার্বিক তত্বাবধায়নে এ বছর চাঁদপুরে পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগের বাছাই পর্ব শুরু করেন।
৫ ফেব্রুয়ারী থেকে চাঁদপুর পুলিশ লাইনস মাঠে পুরুষ ও নারী রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এবছর সাধারন কোটা, মুক্তি কোটা, পোষ্য কোটা, এতিম কোটা, আনসার কোটা, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী (পুরুষ ও নারী) কোটায় ৩ হাজার ২৬ জন আবেদন করেন। আবেদনকারী পুরুষ ২ হাজার ৭শ ৬৫ জন ও নারী ২৬১ জন। বৃহস্পতিবার দিনভর মৌখিক পরীক্ষা শেষে পুরুষ ৭৯ জন ও নারী পদে ১৪ জনসহ মোট ৯৩ জনকে প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত করেন পুলিশ।
পুলিশের চাকরিতে প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হওয়া ৯৩ জনকে বৃহস্পতিবার জেলা পুলিশ লাইনসের মিলনায়তনে সংবর্ধনা দেয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদিপ্ত রায়, সদর সার্কেল ইয়াসির আরাফাত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ কান্তি রায় সহ অনান্য পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা।
পুলিশ সুপার হিসেবে টানা তিনবার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে শেষ করেছেন বলে জানিয়ে মিলন মাহমুদ পিপিএম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ১৭০ জন মৌখিক পরীক্ষা অংশ নিয়েছে। সেখান থেকে মেধার মূল্যায়ন করে ৯৩ জনকে নির্বাচিত করা হয়। চাঁদপুরে টানা তিনবার পুলিশে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন তিনি। স্বচ্ছতার সাথে সবচেয়ে যোগ্য লোককে নিয়োগ দিতে পেরেছেন বলে মনে করেন জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
E/N