আর মাত্র দুই দিন ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই সেতু নির্মাণ ও তদারকিতে যুক্ত ছিলেন চাঁদপুরের কৃতি সন্তান। তিনি হলেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হোসাইন মো. শাহিন। দৈনিক প্রথম আলোকে দেয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
অধ্যাপক হোসাইন মো. শাহিন ২০১৮ সাল থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। পাইলিং সমস্যার সমাধানসহ পদ্মা সেতুর চ্যালেঞ্জিং নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন।
পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পে আপনি কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?
হোসাইন মো. শাহিন: ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর ৬ নম্বর পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর ৬ ও ৭ নম্বর পিলারে তিনটি করে ছয়টি পাইলের নিচের দিকে কাজ করতে গিয়ে নদীর তলদেশে নরম মাটির স্তর পাওয়া যায়। তখন দুটি পিলারের ছয়টি পাইলের ওপরের কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরে আরও ২১টি পিলারের পাইল বসানোর সময় তলদেশে কাদামাটি পাওয়া যায়। তখন প্রকল্পের সবাই পদ্মা সেতুর পাইলের এই সমস্যার সমাধান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ জন্য দীর্ঘদিন মাওয়া প্রান্তের কাজ বন্ধ ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আমাকে পাইলের সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ দলে নেওয়া হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী।
হোসাইন মো. শাহিন: এই প্রকল্পে যুক্ত থাকতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। পদ্মা নদী অত্যধিক খরস্রোতা। এর ওপর সেতু নির্মাণ সবার স্বপ্ন। আবার কাজটি ছিল অনেকটাই কঠিন। এই সেতু নির্মাণে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এখন উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে এসে বলা যায়, আমাদের দেশে কঠিন পরিস্থিতিতে বড় বড় সেতু নির্মাণ অসম্ভব নয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল।
হোসাইন মো. শাহিন: পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ আগাগোড়াই চ্যালেঞ্জ। নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্বেই কোনো না কোনো চ্যালেঞ্জ এসেছে। এখানে নদীশাসন যেমনটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, তেমনি নদীর তলদেশে পাথর না থাকায় পাইলিং করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাদের নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এ জন্য অনেক জটিলতা হয়েছে। পাইলিংয়ের উপরিভাগে স্ক্রিন গ্রাউটিং করে (অতিমিহি সিমেন্টের স্তর) পাইলের ওজন বহনক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। পিলার এবং স্টিলের কাঠামোর সংযোগস্থলে ১০০ টনের বিয়ারিং বসানো হয়েছে। সাধারণত সেতুতে দুটি করে বিয়ারিং বসানো হয়। কিন্তু পদ্মা সেতুতে দুই স্প্যানের সংযোগ স্থলে তিনটি করে বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে।
সেতু নির্মাণে বেশি সময় লেগেছে বলে মনে করেন কি?
হোসাইন মো. শাহিন: পাইলিং কাজটা বছরের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া করা যায় না। কাদামাটির স্তরের কারণে পাইলিংয়ে সময় বেশি লেগেছে। এর জন্য নির্মাণকাজ শেষ হতে এক বছরের মতো সময় বেশি লেগেছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ কী ছিল।
হোসাইন মো. শাহিন: নদীর তলদেশে মাটির ১২২ মিটার গভীরে পাইল বসানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো সেতুতে এত গভীরে পাইল বসাতে হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলিংয়ের নিচে পাথর ও বালু থাকে। কিন্তু পদ্মা সেতুতে কাদামাটি ছিল। পদ্মা সেতুর মতো এত শক্তিশালী বিয়ারিং অন্যান্য সেতুতে সাধারণত ব্যবহৃত হয় না।
হোসাইন মো. শাহিন হাজীগঞ্জ পৌরসভার ১নং ওয়ার্ বলাখাল হাজী বাড়ীর আলহাজ্জ মহসিন মিয়া ও মা হাজী হাফেজা বেগমের গবিত সন্তান। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্ও। তার তিন বোন রয়েছে। হোসাইন মো. শাহিন বলাখাল জেএন উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর সরকারি কলেজ ও বুয়েট পাস করে জাপানে পড়াশোনা শেষ করেন। দাম্পত্য জীবনে তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে সন্তান রয়েছে।
তার ভাই কবির হোসেন পপুলার বিডিনিউজকে বলেন, সরকারের বড় বড় প্রকল্পের কাজে ভাই মেধা শক্তি দিয়ে অবদান রেখে আসছেন। তাঁর সুস্থাস্থ্য ও দীঘায়ূ কামনা করেন তিনি।