হাজীগঞ্জ উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলায় একই পরিবারের চার ভাই কুয়েত রিলিফ জয়েন্ট কমিটি অফ বাংলাদেশ এর গৃহনির্মাণ প্রকল্পের নাম ভাঙ্গিয়ে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা। তারা গত দেড় বছর ধরে ৭ লাখ টাকা দিলে ২০ লাখ টাকার বারোশ স্কোয়ার ফুটের বিল্ডিং করে দেয়ার মৌখিক চুক্তি করেন। এমন ফাঁদে পড়ে শতাধিক পরিবার এখন দিশেহারা।
প্রতারক চক্ররা হলেন, হাজীগঞ্জ উপজেলার ৪ নং কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর তপাদার বাড়ীর আব্দুল লতিফের চার ছেলে। তারা হলো রাসেল ওরফে তারেক তপাদার, কামাল তাপাদার, আলম তপাদার ও মিরাণ তপাদার। এই চার ভাইয়ের সাথে আছেন একই গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বাবু।
জানা গেছে, তারেক তপাদার রাজধানীর একটি ফটোকপি মেশিন দিয়ে ব্যবসা করেন। আর তারপাশে কুয়েত রিলিফ জয়েন্ট কমিটি অফ বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়। সেখান থেকে তারেক ওই অফিসের সাথে একটি সম্পর্ক তৈরি করে। ওই অফিসের সামনে তারেক তার ভাই কামাল তফাদার কে নিয়ে এলাকায় নলকূপ স্থাপন ও মসজিদের বিভিন্ন প্রকল্প এনে দেয়ার কাজে নেমে পড়েন।
মানুষের একটি আস্থা অর্জন করে নতুন করে ওই প্রকল্পের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা শুরু করল তাদের আসল কাজ। প্রকল্পের নাম দিলো- গৃহনির্মাণ প্রকল্প। ৭ লাখ টাকায় ২০ লাখ টাকার ১২শ স্কোয়ার ফুটের অত্যাধুনিক বিল্ডিং। এই প্রকল্পে অর্থ উত্তোলনের কাজে নেমে পড়েন তিন ভাই কামাল তাপাদার, আলম তপাদার ও মিরাণ তপাদার। তাদের মধ্যে এখন আলম তফাদার প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে। বাকি তিন ভাই দেশের মধ্যে আছেন। কিন্তু পলাতক।

গত এক বছর ধরে তাদেরকে না পাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কুয়েত রিলিফ জয়েন্ট কমিটি অফ বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে যায় এলাকাবাসী। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন গৃহহীন নামে কোন প্রকল্প নেই। তারা শুধু নলকূপ ও মসজিদ মাদ্রাসায় বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। তারপর প্রকাশ পায়- তারা চার ভাই মিলে এলাকায় একটি ভয়ংকর প্রতারণা করেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখে গেছে, হাজীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের সুহিলপুর গ্রামের বাসিন্দা মজিবুর রহমান এখন রান্নাঘরে বসবাস করছেন। তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে নিয়ে গেছে প্রতারক চক্র।
তিনি বলেন, প্রতারকচক্র কিছু ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ক্রয় করে দেন। সাথে একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে নিয়ে যান। ৫ লাখ টাকা দিয়ে ইলেকট্রিক সরঞ্জাম পেয়েছি প্রায় এক হাজার টাকার!
প্যরাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল। দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন তার ছেলে প্রবাসে আছেন। ওই প্রতারক চক্র হঠাৎ করে তার ছেলের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। মোস্তফা কামালের ছেলে জনির সাথে দুইটি বিল্ডিং করার চুক্তি হয় ১৫ লাখ টাকার। ১৫ লাখ টাকার সাত লাখ টাকা এই মোস্তফা কামালের ভবন করা এবং তার আত্মীয় হারুন নামের একজনের ৮ লাখ টাকা তার ভবন করার কথা। তাও মৌখিক চুক্তি।
ভোক্তভুগী মোস্তফা কামাল বলেন, প্রতারক চক্র তারা চার ভাই আমার চাচাতো ভাই। তারা প্রথমে নলকূপ, পরে মসজিদের বরাদ্দ দিয়ে আমাদেরকে বিশ্বাস লাগায়।
এলাকাবাসী জানায়, শুধু হাজীগঞ্জ উপজেলায় নয় শাহরাস্তি, কচুয়া-মতলব উপজেলায়ও একাধিক পরিবারের সাথে গৃহহীন প্রকল্পের নামে চার ভাই হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।মতলব দক্ষিণ ও উত্তর উপজেলায় প্রায় ৩০টি পরিবার, কচুয়া উপজেলায় ১০থেকে ১৫ টি পরিবার। শাহরাস্তি উপজেলার প্রায় দশটি পরিবার এবং ফরিদগঞ্জ উপজেলা ও কয়েকটি পরিবার। এছাড়া হাজীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টি পরিবার এই চার ভাইয়ের খপ্পরে পড়ে এখন দিশেহারা।
সরোজমিনে গিয়ে আরো জানা গেছে, হাজীগঞ্জ উপজেলার প্যারাপুর গ্রামে ২টি, কালোচোঁ গ্রামের পাঁচটি, পৌসভার মনিনাগ গ্রামে ৫ টি, সিহিরচোঁ গ্রামে একটি, মাড়কি গ্রামে দুইটি, উঁড়পুর, ছিলাচোঁ, ভাটরা, সহ প্রায় শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতে নিয়েছে এই প্রতারক চক্র। প্রতারক চক্রের টার্গেট ছিল প্রবাসী পরিবার, শিক্ষকসহ সমাজের মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো। প্রতারক চক্র ভবনগুলো ছাদ করেছে এমন সংখ্যা প্রায় দশটি। এক বছর ধরে ওই ভবনগুলোর কাজ বন্ধ। আর টাকা নিয়ে ভবন করে নাই, কোন কাজে হাত দেয় নাই, এমন সংখ্যার কোন হিসেব নেই।
প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়া প্যরাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরীফ আহমেদ খান বলেন, তার ২২ বছরের জমানো টাকা নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। কামাল তপাদারের সাথে এখন আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের বাসিন্দা খাদিজা আক্তার। তার ভাইয়ের নাম আরিফ। আরিফ আর এই প্রতারক কামাল বন্ধু। এই কামাল তার বন্ধুর সাথেও করেছে প্রতারণা। প্রবাসে আরিফের সাথে কন্টাক করা হয় ১১ লাখ টাকা। তার ভবনের কাজ অর্ধেক করে, বাকি অর্ধেকটা এক বছর ধরে কাজ বন্ধ। শুধু আরিফের কাজ বন্ধ নয় তার বোন খাদিজার কাছ থেকে নিয়েছে পাঁচ লাখ টাকা। খাদিজার স্বামী একটি মসজিদে ইমামতি করেন।
একই এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম তিনিও থাকেন প্রবাসে। তাজুল ইসলামের স্ত্রী জানান, তাদের কাছ থেকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। ছাদ ঢালাই দিয়ে আর কোন কাজ করেনি।
শাহরাস্তি উপজেলার ভুক্তভোগী মেহেদী। মেহেদি তার পরিবারের চারজনের বিল্ডিংয়ের জন্য ৭ লাখ টাকা জমা দেন কামাল তপাদারের কাছে।
কচুয়া উপজেলার কাদলা গ্রামের এক গৃহবধূর কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়েছে। তার ভাই কামাল তপাদারের কাজের একজন কন্টাকটার ছিল। সে নিজেই ভুক্তভোগী। তার বোনের টাকা দিয়ে এখন নিরুপায়।
সুহিলপুর বাজারের ব্যবসায়ী হান্নান। তিনি কামাল তপাদারকে দিয়েছেন ৭ লাখ টাকা। সুহিলপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোঃ কাজল। তার কাছ থেকেও ইট সিমেন্ট নিয়ে বাকি টাকা দেয়নি এই প্রতারকচক্র।
প্রতারক কামাল তপাদারের মুঠফোন নম্বরে কথা বলার চেষ্টা করলে তার মুঠফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে একটি কল রেকর্ডে কামাল বলেছে, ভবনের কাজ আর করতে চান না। নিজের এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যদি সুযোগ হয় নলকূপ অথবা মসজিদ-মাদ্রাসায় কোনো বরাদ্দ লাগলে সেটির কাজ করবেন।