নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দখলদার পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিজয় সূচীত হয়। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। বাঙালীর বিজয়ের দিন ও মাস। একই বছরের ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যে কালজয়ী বক্তব্য রাখেন তাতে তিনি স্বাধীনতার সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। অন্যতম উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা হলো, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম “। জাতির জনক প্রথমে মুক্তির কথা বলেছেন। এ মুক্তি অর্থনৈতিক মুক্তি, কুসংস্কার থেকে মুক্তি, সামাজিক ও রাষ্টীয় অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, শোষণ – বঞ্চনা ও নিরক্ষরতা থেকে মুক্তি। হাজার বছরের অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার পর্বত ডিঙ্গিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেন এবং লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি।

স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রায় সকল সূচকে স্বাধীন বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে। পরাজিত পাকিস্তানের চেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রায় দুই দশক আগে থেকেই এগিয়ে রয়েছে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে। কয়েকটি সূচকে এমনকি ভারতকেও আমরা পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছি।
শিক্ষা বিশেষকরে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি খুবই আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৪%। সরকারি ও বেসরকারি মিলে এখানে চালু রয়েছে ১৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয়।
চিকিৎসা খাতে উন্নতি এখন এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ বর্তমানে বাংলাদেশেই পাওয়া যায়।
দারিদ্র্যের মাত্রা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ২০.৫%। মাথাপিছু আয় বর্তমানে ২০৬৪ মার্কিন ডলার যা স্বাধীনতার পূর্বে ছিল ১০০ ডলারের নিচে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ২,৮৪,৪৮৩ ইউ এস ডলারের অধিক যা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি।
অবকাঠামো ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশর অগ্রগতি পৌছেছে এক ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের শহর গ্রাম নির্বিশেষে সর্বত্র পাকা ও পিচঢালাই রাস্তা দিয়ে হালকা ও ভারি যানবাহন চলাচল করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনী যদিও দেশের সমুদ্র বন্দরসহ যোগাযোগের সকল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। যোগাযোগের ম্যাগা প্রকল্প পদ্মাসেতু এখন দিনের আলোর মত সত্য। ব্যয়ের পুরো ৩১ হাজার কোটি টাকাই বাংলাদেশের নিজস্ব। নির্মিত উড়ালসেতু ও নির্মিতব্য মেট্রোরেল এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল যোগাযোগের এক নবদিগন্ত।
বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ক্রমাগত এগিয়ে চলছে। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশর অবস্থান মহাশক্তিধর চীনের এক ধাপ নিচে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে অনেক বছর যাবৎ।
বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট এখন আর শতকোটির ঘরে নেই,লক্ষ কোটিতে উন্নীত।২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেটের আাকার ৫,৬৮,০০০ কোটি টাকা। যা দেশের জিডিপির ১৭.৯%। বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫.২৪%।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সাথে বাংলাদেশ কারিগরি ও প্রকৌশলগত সক্ষমতায়ও এগিয়ে। নিজস্ব প্রকৌশলী ও জনবল দ্বারা তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে দেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বড় বড় জাহাজ তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের দক্ষতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে।
অর্থনীতি,শিক্ষা,স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, সর্বক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নতি তার সবটাই আমাদের বিজয়ের ফসল। কিন্তু এটাও সত্য, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ এর মধ্যবর্তী সময়ে অর্থনীতির সচল চাকা অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে উন্নতির পথে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। এর লাগাম টেনে ধরতে হবে শক্ত হাতে। তবেই আমরা পাবো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। সোনার বাংলা।