আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস উপলক্ষে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও টিআইবি’র আয়োজনে ভার্চুয়াল আলোচনা, দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। দিবসটির উপর এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো-কোভিড-১৯ মোকাবিলায় চাই দুর্নীতির প্রতি শুন্য সহনশীলতা: দুর্নীতি থামাও, জীবন বাঁচাও।
অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে সনাক-চাঁদপুরের প্রাক্তন সভাপতি ও চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা কাজী শাহাদাতের সভাপতিত্বে ‘তথ্য অধিকার আইন দুর্নীতি প্রতিরোধে সবচেয়ে অধিক কার্যকর হাতিয়ার’ বিষয়ের উপর ভার্চুয়াল বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতার পক্ষ দল চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের ১ম বক্তা মুনিরা খাতুন, ২য় বক্তা ফাইরূজ ইসলাম (পুষ্পিতা) ও দলনেতা আসিফা বিনতে হারুন এবং বিপক্ষ দল চাঁদপুর সরকারি কলেজের ১ম বক্তা মিঠুন চন্দ্র ত্রিপুরা, ২য় বক্তা রোবেল হোসেন ও দলনেতা মুশফিকা ইসলাম। প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বক্তা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের দলপ্রধান আসিফা বিনতে হারুন। এবং বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ। প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সনাক-চাঁদপুরের সহ-সভাপতি ও চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমির অধ্যক্ষ ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া, রয়মনেননেছা মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আফরোজা খাতুন মেরী ও সনাক-চাঁদপুরের সহ-সভাপতি সবিতা বিশ্বাস। সভাপতি তার বক্তব্যে বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য অধিকার আইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন। উভয় পক্ষই খুবই চমৎকারভাবে তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে। তিনি আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইন তখনই কার্যকর হবে যখন এর প্রয়োগ সঠিকভাবে করা হবে। দুর্নীতি রোধ করতে হলে আমাদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিতার্কিকদের যে উচ্চারণ ও বস্তুনিষ্ঠতা তা সত্যিই খুবই মুগ্ধকর। আমি মনে করি বিতর্কের জয় হয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে সনাকের সহ-সভাপতি ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, দুর্নীতি ব্যাপকভাবে আমাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। সনাক-টিআইবি প্রতিবছরই এই দিবস উপলক্ষে ব্যতিক্রম কিছু আয়োজন করে থাকে। তেমনি আজকের বিতর্কের আয়োজনটিও ছিলো চমৎকার। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি বিরোধী দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র নগদ টাকা পয়সা অবৈধভাবে লেনদেন হওয়াটাই দুর্নীতি নয়। সেবা গ্রহিতাদের সঠিকভাবে সেবা না দেওয়া, সঠিক সময়ে অফিসে না আসা, সেবা গ্রহিতাদের সাথে ভালো আচরণ না করাও দুর্নীতি। তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোন না কোনভাবে দুর্নীতি হচ্ছে। এসকল দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা অবশ্যই দরকার। তবে শুধুমাত্র সচেতনতা দিয়েই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন করা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য ও এতো সুন্দর একটি আয়োজন করার জন্য সনাক-টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কানিজ ফাতেমা বলেন, দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি অত্যন্ত প্রানবন্ত ছিলো। দুদলই খুবই চমৎকার বক্তব্য রেখেছে। তিনি বলেন, করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি আমরা কঠিনভাবে মোকাবিলা করেছি বলেই আমরা সফল হয়েছি। চাঁদপুরের রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, চিকিৎসক, সাংবাদিক, এনজিও, তরুণ সমাজ, সুশীল সমাজ সবাই এই দুর্যোগকালীন সময়ে কাজ করেছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি মোকাবিলা কখনোই শতভাগ নির্মুল করা সম্ভব নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন আমাদের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকাই পারে দুর্নীতির নির্মূলের মূল হাতিয়ার হিসাবে কাজ করতে। তিনি এধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য সনাক-টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাজেদা পলিন বলেন, কোভিড-১৯ বাংলাদেশে যখন আসলো তখন আমরা চিকিৎসকরাও পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম না। তারপরও আমরা সীমিত জনবল নিয়েও সমাজের সকল স্তরের জনগণের সহযোগিতায় কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ঘুষ নেওয়াটাই দুর্নীতি নয়, সময়মতো অফিসে না আসাটাও দুর্নীতি। গ্লাপস ও মাস্ক নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সকল পর্যায়ে বা সকল প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বন্ধ না হলে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমাদেরকে বেগ পেতে হবে। তিনি আরও বলেন, সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় করোনার ২য় ধাপ মোকাবিলা করতে পারবো বলে প্রত্যাশা করছি। তিনি এধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য সনাক-টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান।
টিআইবি’র সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (সিই) মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন, সুশাসন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দুর্নীতি প্রতিরোধ করা খুবই জরুরী। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থ প্রাচারে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ২য় স্থানে আছে। যা খুবই উদ্বেগজণক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি শুন্য সহনশীলতায় আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ কোন না কোন ভাবে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। প্রায় ৯০ ভাগ মানুষকে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতির যে ভয়াবহতা তা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যহত হবে। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
টিআইবি’র এরিয়া ম্যানেজার মোঃ মাসুদ রানার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সনাকের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ মোশারেফ হোসেন। দিবসটির উপর ধারনাপত্র উপস্থাপন করেন সনাকের সহ-সভাপতি সবিতা বিশ্বাস। ধারনাপত্রের উপর উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রয়মনেননেছা মহিলা ডিগ্রি কলেজর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আফরোজা খাতুন মেরি, ইয়েস দলনেতা রাজীব দাস, সিসিডিএফ এর সভাপতি ভিভিয়ান ঘোষ, চাঁদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মুশফিকা ইসলাম ও মেহেদী হাসান নবীন।
সভাপতির বক্তব্যে সনাকের সহ-সভাপতি ডাঃ পীষূষ কান্তি বড়ুয়া বলেন, বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। প্রতি বক্তাই তথ্যবহুল বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। তিনি বলেন, সনাক-টিআইবি কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়। কোন ব্যক্তি দুর্নীতি করলে তাকে আইনের আওতায় আনাও সনাক-টিআইবি’র কাজ নয়। সনাক-টিআইবি’র কাজ হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা ও আন্দোলন গড়ে তোলা। পাশাপাশি কোথায় কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে তা চিহ্নিত করে সরকারকে সহযোগিতা করা। জনগণের সাথে প্রশাসনের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করাই সনাক-টিআইবি’র মূল লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইন সকল ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করা দরকার। তাহলেই দেশে দুর্নীতি সহনীয় মাত্রায় চলে আসবে এবং আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো। দুর্জয় তারুণ্য দুর্নীতি রুখবেই। নিজে মাস্ক পরবো অন্যকে মাস্ক পরতে উৎসাহিত করবো। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে তথ্য আবেদন ফরম পূরণ প্রতিযোগিতা, ইয়েস ও ইয়েস ফ্রেন্ডস গ্রুপের আয়োজনে ক্লাস্টারভিত্তিক দুর্নীতি বিরোধী গল্প বলা প্রতিযোগিতা ও সনাকের আয়োজনে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনলাইনের মাধ্যমে দুর্নীতি বিরোধী কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতাগুলোর ফলাফল ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান।
এছাড়াও ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, টিআইবি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (সিই) কুমিল্লা ক্লাস্টার মোঃ হুমায়ুন কবির, সাংবাদিকবৃন্দ, বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ, সুশীল সমাজের নের্তৃবৃন্দ, সনাক-চাঁদপুরের সদস্যবৃন্দ, স্বজন, ইয়েস, ইয়েস ফ্রেন্ডস, বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিবৃন্দ এবং সরকারি -বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিববৃন্দ।