জনবল, অবকাঠামো ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে চাঁদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১৯টি পদ শূন্য থাকায় রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। নেই এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কমিটি না থাকায় হাসপাতালের উন্নয়ন কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।
চাঁদপুরের একমাত্র বিশেষায়িত ডায়াবেটিক হাসপাতালটি ২০০৮ সালে ছয়তলা ভবনের ভিত্তির ওপর তিনতলা নির্মাণ করে কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু ১৮ বছরেও বাকি তিনতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। ২৫ শয্যার অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ১৮টি শয্যা। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ রোগী হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। গত এক বছরে প্রায় ৪০ হাজার রোগী এখান থেকে সেবা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এনডোক্রাইনোলজি, মেডিসিন ও গাইনিকলজি বিভাগে কোনো কনসালটেন্ট নেই। সার্জারি ও হরমোন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পাশাপাশি মেডিকেল অফিসার ও নার্সেরও রয়েছে সংকট। ফলে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম হওয়ায় চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে যেতে হচ্ছে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা।
হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ছাবেরা ইসলাম বলেন, হাসপাতালে সব ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন বিভাগে কনসালটেন্টের সংকট রয়েছে। মেডিকেল অফিসারেরও ঘাটতি রয়েছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আরও যন্ত্রপাতি প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরাও সেবার মান বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি অন্যান্য রোগের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করানোর ভোগান্তি কমবে।
হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ খবির উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে এবং দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। দ্রুত ভবনের বাকি অংশের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, ল্যাব আধুনিকায়ন এবং ইনডোর বিভাগকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে রোগীদের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া আরও সহজ হবে।
এদিকে চাঁদপুর ডায়াবেটিস সমিতির কমিটির মেয়াদ প্রায় চার বছর আগে শেষ হলেও নতুন কমিটি গঠন হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন কমিটি না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালটিতে কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে ছয়তলা ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ এবং কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার চালুর দাবি দীর্ঘদিনের।
হাসপাতালের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কনসালটেন্ট, গাইনী, মেডিকেল অফিসারসহ কয়েকটি পদে ১৮ জনবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। শিগগিরই যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানান তিনি।
দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জেলার একমাত্র বিশেষায়িত ডায়াবেটিক হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা আরও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।