POPULAR BD NEWS
Popular BD News Logo

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই

মোহাম্মদ শামছুজ্জামান | প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২০ | সময়: ১২:০২ অপরাহ্ণ
আজ ৭ ডিসেম্বর। আমাদের পারিবার তথা গোটা মুন্সী পরিবারের জন্যই আজকের দিনটি সবচাইতে বড় একটি শোকের দিন। আজ থেকে ঠিক ১৩ বছর পূর্বে আজকের এই দিনে এমনই একটি ভোর সকালে গুমের মাঝে ঠিক সকাল ৮টা হবে, মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। প্রথমবার রিং হলো রিসিভ করতে পারিনি। পূনরায় আবার যখন ফোন বেজে উঠলো, ঘুমের গোরেই রিসিভ করলাম।
অপর প্রান্ত থেকে ভবি (চাচার বড় ছেলে) শুধু এতটুকুই বল্ল ”ভাই বাবা আর নেই” এতটুকুই, এরপর শুধুই কান্নার শব্দ। সত্যিই সে সময়ে আমার হৃদয়ের অনুভুতি যা আমি লিখে বুজাতে পারবোনা। আমার জীবনে ঐদিনটাই ছিলো সবচাইতে বেশী বপদনার এবং বেশি কষ্টদায়ক। চাচার মৃত্যু সংবাদ শুনে নিজেকে ঠিক সামলে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছে, আমি নির্জর নিথর নিস্তেজ হয়ে গেলাম। বিছানা থেকে সোজা হয়ে বসে শুধুই কেঁদেছি। চাচার মৃত্যু সংবাদ কিছুতেই যেনো মেনে নিতে পারছিলামনা। স্মৃতির পটে ভাসতে শুরু করলো চাচার সাথে জীবনের সুখ দুঃখ ও মধুময় স্মৃতিগুলো। সে যে কতরকম স্মৃতি। পারিবারিক রাজনৈতিক সামাজিক সবকিছু চোখের সামনে ভাসতে শুরু করলো।
আমার সাথে চাচার সর্বশেষ শেয়ারিংটা ছিলো এমন। একদিন চাচা আমায় বাসায় ডেকে নিলেন, ডেকে নিয়ে বল্লেন তোর সাথে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। এরপর আলাপ চারিতায় চাচা বল্ল শামছু আমার অনেক ঋন। ব্যাংক লোনটা অদৌ শোধ করতে পারিনি। আয় রোজগারের পথ গুলাও আমার সীমিত। জমিজমাও প্রায় সব বিক্রি করে পেলেছি। আমার বাসা রেস্টহাউজ আর কারখানা আর বাড়ি ভিটা ছাড়া এখন আর কিছু নেই। আর এসব ব্যাংকে মডগেজ দেয়া।
কি করি বলতো। জানতে চাইলাম জমি বিক্রি করে টাকা পয়সা কি করলেন.? চাচা বল্ল সব আমি এই রাজনীতি করতে গিয়ে শেষ করে দিয়েছিরে বাবা, আমার হাতে এখন আর তেমন কিচ্ছু নেই। আর কারখানাটাও ভাড়া দিয়ে দিছি। রাজনৈতিক কারনে পরিবারের খোজখবরও ঠিকমত রাখতে পারিনি, মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে সারলেও ছেলেদের জন্যে যে কিছুই করা হলোনা। আমার আয় সীমিত, কিন্তু খরচ গুলাত তুইও দেখিস। আমি এখন কি করবো বল……!
এখনতো আমি আর পারছিনারে। আমাকে একটু পরামর্শ দে, এই থেকে আমার মুক্তির উপায় কি.? আমি অবাক দৃষ্টিতে চাচার মুখপানে তাকিয়ে রইলাম। জানতে চাইলাম চাচা বাহিরের সকল সম্পত্তি আপনি কবে বিক্রি করলেন.!? আমি যে এর কিছুই জানলাম না.!! আমিতো জানি জমিগুলা সবই ঠিকঠাক আছে এখনো সব আপনারই।। চাচা বল্ল তোকে আগে বলিনি কি মনে করিস আবার। ব্যাংক লোনের ইন্টারেস্ট, দলের সম্মেলন, সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন ও বিভিন্ন নির্বাচনে যা দেনা করেছি তা শোধ করতেই আমাকে জমিগুলা বিক্রি করতে হয়েছে । এগুলা এখন শুধু রেজিষ্ট্রিটা বাকী। লেনদেনও প্রায় ক্লিয়ার।
এই কথা শুনে সেদিন নির্বাক হয়ে চাচার চোখের দিকে কিছু সময় অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম চাচার চোখের নিচে কালি জমে আছে, শুধু ষ্ট্রেচের কারনে। আমিও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় ছিলোনা। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর এরপর চাচাকে ভরসা দিলাম, বল্লাম চাচা সব ঠিক হয়ে যাবে। ধৈর্য ধারন করুন। আল্লাহ্ পাক আপনাকে এর সঠিক একটা পায়সালা দিবেই ইনশাআল্লাহ্। আপনিতো আর কারো হক মেরে খান নাই, দলকে দিয়েছেন কিন্তু দল বেঁচে খান নাই। আপনি একটা কাজ করুন আগে ব্যাংক লোনটা পরিশোধের উদ্দেগ নিন কেননা এই লোনটাই আপনাকে বেশি পিছু টানছে। আপনাকে গুরে দাঁড়াতে আপাদত এর বিকল্প নেই। আপনি প্রয়োজনে বাসার সামনে পুরো বাউন্ডারি জুড়ে মার্কেট করুন। এখানে মিনিমাম ২০টা দোকানতো হবেই, এর মধ্যে কয়েকটা দোকানের পজেশন সেল করলেই আমার বিশ্বাস আপনার ব্যাংক লোনটা পরিশোধ করার মত টাকা হাতে চলে আসবে এবং মার্কেট করার দেনাও শোধ করতে পারবেন। তারপর মাসিক একটা ইনকামতো আসবেই। সে মতে চাচা রাজিও হলো।
চাচা বল্ল কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়, কাজ শুরু করতে কিছু টাকাতো লাগবে সেটা কই পাবো.! তখন আমি বল্লাম, ঠিক আছে আমি বালির যোগান দিবো যা লাগে, আপনি বাকী গুলো একটা কন্ডিশনে একেকজনের কাছ থেকে একেকটা সংগ্রহ করুন। চাচা রাজি হয়ে সে মতে বিভিন্ন জনের সহায়তা চেয়ে কেউ টিন দিবে, কেউ ব্রিকস্ দিবে, কেউ সিমেন্ট দিবে, কেউ কাঠ দিবে নিশ্চিত করলেন। সে মোতাবেক কাজ শুরুর প্রক্রিয়াও শুরু হলো, কিন্তু বিপত্তি ঠেকলো আরেক জায়গায়। চাচা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থ হবার দ্বিতীয় দিনেই চাচাকে চিকিৎসার উদ্দেশে ঢাকা পাড়ি দিতে হলো, কিন্তু সেদিন আর আমার সাথে দেখা হয়নি। আর এই যাওয়াটাই ছিলো চাচার হাজিগঞ্জ থেকে শেষ বিদায়। ঢাকায় গিয়ে সম্ভবত চাচার হাতে ছোট্র একটা অপারেশন ছিলো। অপারেশন শেষে বাসায় ফিরে চাচার ছোট ছেলে জয় আমাকে ফোন করে জানালো ভাইয়া আব্বুর অপারেশন হয়েছে। আমি জিগ্যেস করলাম চাচার শরীরের এখন কি অবস্থা, কোথায় তিনি.? জয় বল্লো আব্বুকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে, এখন গুমায়।
তখন জয়কে বল্লাম চাচাকে গুমে রেখে আমাকে ফোন দিলা যে.!! বল্ল আব্বু বলেছে আব্বু যখন গুমাবে তখন আপনাকে কল দিতে। জানতে চাইলাম এর কারন.!? জয় বল্ল জানিনাতো। তখন জয়কে বল্লাম ওকে বুজতে পারছি। আসলে চাচা আমাকে ঐ সময়টাতে পাশে চেয়েছিলো। যে কারনে অভিমান করেই জয়কে এমনটি করতে বলেছে। তারপর জয়কে বল্লাম ঠিক আছে চাচার গুম ভাঙ্গলে আমাকে একটু জানাইও। আমি কল ব্যাক করবো। তখন সম্ভবত রাত ৯টা কি ৯:৩০ হবে। এরপর রাতে আর চাচার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি। সম্ভবত রাতে চাচার ঘুম ভাঙ্গতেই দেরী হয়েছে এবং ব্যাপারটি তা-ই ছিলো। এরপর মাত্র কয়েকটা ঘন্টার ব্যাবধান মাত্র। চাচার মৃত্যু সংবাদ, যে কারনে আমাদের ঘোটা মুন্সী পরিবারে নেমে আসলো এক শোকের ছায়া। চাচা পরপারে পাড়ি জমালেন, চাচার অভিমান ভাঙ্গানোর আমার আর সুযোগ হয়নি। চাচা পুনরায় হাজিগঞ্জে ফিরলেন তবে এবার লাশ হয়ে ফিরলেন।
এভাবে অভিমান করে চাচা হঠাৎ করে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন এর জন্য আমার মানুষিক প্রস্তুতি ছিলোনা। যে কারনে এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে চাচা দুনিয়ায় নেই। আমার ধারনা চাচা এখনো আছেন, হয়তো কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন। অভিমান করেই হয়তো আমার সাথে কথা বলছেন না। আজ চাচার ১৩ তম মৃত্য বার্ষিকীতে এসেও ওনার অস্তিত্বকে আমি ওভাবেই অনুভব করি। চাচার চলে যাওয়া সেটা যে আমাদের বা ওনার পরিবারের জন্য কতটা ক্ষতির বা কতটা বেদনার তা আমি বলে শেষ করতে পারবোনা। আর ওটাই ছিলো আমাদের জন্য নিয়তির পায়সালা।
কেননা আল্লাহ ভালো মানুষগুলোকে দুনিয়াতে বেশিদিন রাখেন না। চাচার অকাল মৃত্যুতে হাজিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ যেমনি করে হয়েছে নেতৃত্ব শুন্য, আর আমরাও পারিবারিক ভাবে হারালাম আমাদের পিতৃতুল্য প্রিয় অভিভাবককে। চাচার মৃত্যুতে যে ক্ষতি পরিবার কিংবা দলের হয়েছে, সেই ক্ষতি অদ্যপর্যন্ত আমরা কেউই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হইনি।
চাচা আপনি মরিয়াও আমার কাছে অমর হয়ে আছেন। আমি যতকাল বাঁচবো আপনি আমার অন্তর জুড়েই ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। আপনি ওপারে ভাল থাকুন এবং মহান আল্লাহ আপনার সকল ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ চুড়ায় আসীন করুন …. আমিন, আমৃত্যুকাল আপনার জন্য আমার এই প্রার্থনাই থাকবে।
                                                                                                           মোহাম্মদ শামছুজ্জামান
                                                                                                          সাংগঠনিক সম্পাদক
পপুলার বিডিনিউজ | বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশে দুরন্ত
কার্যালয়: কেনাকাটা মার্কেট, ৪র্থ তলা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৬-৪৬৯৫০৫ | ইমেইল: newspopular2020@gmail.com

© 2026 পপুলার বিডিনিউজ — অনুমতি ছাড়া লেখা/ছবি/ভিডিও ব্যবহার বেআইনি
প্রিন্ট করুন